রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান সিলেটের মাহতাবুর রহমানের বিরুদ্ধে ২ ডজন অনিয়মের অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক




প্রভাব খাটিয়ে এনআরবি ব্যাংকে একক আধিপত্য বিস্তার করেছেন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহতাবুর রহমান নাসির। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আগের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সুবিধা দেয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সমপ্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের কাছে এ অভিযোগ করেন ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ। এ ছাড়া ব্যাংকটির ৭ উদ্যোক্তা পরিচালকও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন নাসিরের বিরুদ্ধে। ছয় পাতার এ অভিযোগপত্রে প্রায় দুই ডজন অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।


এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- নীতিমালা লঙ্ঘন করে চেয়ারম্যান কর্তৃক ব্যাংকে পারিবারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জোর করে ছুটিতে পাঠানো, ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির ক্ষমতা খর্ব করা, গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পদত্যাগে বাধ্য করা, ঋণখেলাপি হয়েও ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ আঁকড়ে রাখা, ব্যাংককে নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসা সমপ্রসারণে ব্যবহার করা।

২০১৯ সাল শেষে এনআরবি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬১ কোটি টাকা। আর নিট লোকসান ছিল ১২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। তিন হাজার ৮৯৩ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে এ পরিমাণ খেলাপি উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে। এতে আরো বলা হয়, ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করা ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানকে সরিয়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ দখল করেন মোহাম্মদ মাহতাবুর রহমান।

চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান তাতইয়ামা কবিরের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি লুটেরা চক্র এ ব্যাংকটিকে তলাবিহীন ঝুড়িতে রূপান্তরের সব কর্মতৎপরতা সম্পন্ন করেছে। এনআরবি ব্যাংকের আমানতের জিম্মাদারি নিয়ে বেশির ভাগ পরিচালক এখন শঙ্কিত। ব্যাংক পরিচালনায় চেয়ারম্যানের সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিক ব্যর্থতার দায় বইতে না পেরে এনআরবি ব্যাংক এখন লোকসানের চোরাবালিতে হারিয়ে যেতে বসেছে।


অভিযোগপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এনআরবি ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মাহতাবুর রহমান প্রতারণা ও লুকোচুরি শুরু করেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের যে কোনো চিঠি ও পরিদর্শন প্রতিবেদন সম্পর্কে পরিচালনা পর্ষদকে অন্ধকারে রাখার নীতি গ্রহণ করেন। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাস পরই ২০১৬ সালের ৩০শে আগস্ট ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার জন্য স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার অনুকূলে তাকে ঋণখেলাপি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার এনআরবি ব্যাংকের পরিচালক পদ শূন্য ঘোষণা করে। এ বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রেখে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নজর এড়িয়ে মাহতাবুর রহমান উচ্চ আদালতের স্টে অর্ডার নেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনআরবি ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। কিন্তু এনআরবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে এ বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি।

শুধু তাই নয়, এনআরবি ব্যাংকের পর্ষদের অগোচরে চেয়ারম্যান হিসেবে ২০১৬ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর ও ৯ই অক্টোবরসহ পরবর্তী ক্ষেত্রে সব করেসপন্ডেন্ট ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করেন তিনি, যদিও আইন অনুযায়ী মাহতাবুর রহমানের এসব কর্মকাণ্ড ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নামে-বেনামে স্ত্রী, ছেলে, ভাই, ভাতিজাসহ আত্মীয়স্বজনের নামে শেয়ার কিনেছেন মাহতাবুর রহমান।

মাহতাবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের কাছে ব্যাংকটি এখন জিম্মি। এক্ষেত্রে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করছে ব্যাংকের পরিচালকদের মধ্যে থাকা দুর্নীতিবাজ একটি চক্র।
এনআরবি ব্যাংক যাত্রা করার সময় শুধু মাহতাবুর রহমানই শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। কিন্তু পরে তার পরিবারের সাত সদস্যের নামে তিনি শেয়ার কিনেছেন। বর্তমানে এনআরবি ব্যাংকে মাহতাবুর রহমান ও তার পরিবারের শেয়ারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। নামে-বেনামে মাহতাবুর রহমানের কিনে নেয়া প্রতিটি শেয়ার বিক্রি হয়েছে ১৮-২০ টাকা দরে। অথচ সরকারের কর ফাঁকি দিতে শেয়ারের দর দেখানো হয়েছে ১১-১২ টাকা করে।

চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমানের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরোধিতা করায় এনআরবি ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির (ইসি) সব ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে। ইসি কমিটির সব কাজ চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমান নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন।


২০১৮ সালের ২৯শে জুলাই মাহতাবুর রহমানের মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের তারিখের সঙ্গে মিল রেখে ২৮শে জুলাই সিলেটে আয়োজন করা হয় এনআরবি ব্যাংকের এজিএম। ওই বিয়েতে ব্যাংকের গাড়ি ও লোকবল ব্যবহার করা হয়। পরে একই বছরের ২৫ ও ২৬শে ডিসেম্বর চেয়ারম্যানের ভাতিজার বিয়ের অনুষ্ঠানের সঙ্গে মিল রেখে ২৪শে ডিসেম্বর সিলেট মেডিকেলে এনআরবি ব্যাংকের শাখা খোলা হয়। এ অনুষ্ঠানেও তিনি ব্যাংকের বেশ কয়েকটি গাড়ি ব্যবহার করেন। একটি গাড়ি তার পরিবারের সদস্যদের জন্য সারা বছর সিলেটে অবস্থান করে।
মাহতাবুর রহমান হেলিকপ্টারে চড়ে এনআরবি ব্যাংকের জাজিরা শাখা, খুলনা শাখা, চাটখিল শাখা ও ফরিদপুর শাখা উদ্বোধন করতে গেছেন, যদিও ওই শাখাগুলোর পরিস্থিতি সিলেট মেডিকেল শাখার মতোই দৈন্যদশায় আছে।

নিজের দুই আপনজন ও ব্যক্তিগত উপদেষ্টাকে ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে মনোনীত করেছেন। তাদের প্রতি মাসে আইনবহির্ভূতভাবে ১ লাখ টাকা করে মাসোহারা দেয়া হয়।
পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য একটি প্যানেল গঠন করেছিল। কিন্তু এ প্যানেল উপেক্ষা করে তিনি নিজেই উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেন। যে ব্যক্তিকে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধে বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারিতে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এসব দুর্নীতির অবসান করতে গভর্নরের কাছে তিনটি অনুরোধ করেছেন প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানসহ ৭ উদ্যোক্তা পরিচালক। এগুলোর মধ্যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এনআরবি ব্যাংকের বর্তমান পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন করা; গত ৪ বছরে এনআরবি ব্যাংকে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির সত্য উদ্‌ঘাটনে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি বিশেষ পরিদর্শক দল পাঠানো এবং প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড় করাতে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া।


এনআরবি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান যুক্তরাজ্য প্রবাসী ইকবাল আহমেদ বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাতৃভূমির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে ৪৬ জন প্রবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এনআরবি ব্যাংক করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু এরই মধ্যে আমাদের স্বপ্নের মৃত্যু হতে চলেছে। ব্যাংকটি দুষ্ট লোকের খপ্পরে পড়েছে। গত ৪ বছর চেষ্টা করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এ জন্য ব্যাংকিং খাতের অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আমরা বাধ্য হয়ে অভিযোগ দিয়েছি। আশা করছি, আমরা ন্যায়বিচার পাবো।