রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



Sex Cams

চুনারুঘাটে স্ত্রীর সামনে প্রেমিকাকে ধর্ষণের পর হত্যা

নিউজ ডেস্ক




হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে স্ত্রীর চাপে প্রেমিকাকে হত্যা করে লাশ টিলায় ফেলে দেন আফসার মিয়া ও তাঁর স্ত্রী রিপা বেগম। স্ত্রীর সামনেই প্রেমিকাকে ধর্ষণও করেন তিনি। বুধবার আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ তথ্য জানান তাঁরা। দেন ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনাও।

বুধবার তাঁদের জবানবন্দি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রেকর্ড করা হয়। সন্ধ্যায় এ বিষয়ে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানান হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা।


পুলিশ সুপার বলেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে একদিন ঘটনাচক্রে আসামি চুনারুঘাট উপজেলার পাচারগাঁও গ্রামের আফসার মিয়া ওরফে কাওছারের স্ত্রী রিপা বেগমের সঙ্গে জনৈক শুকলা ও নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার কামালপুর গ্রামের বাসিন্দা খোরশেদ আলী মজুমদারের মেয়ে রোকসানা আক্তার মিষ্টির পরিচয় হয়। এ সময়ে ভিকটিম মিষ্টি ও শুকলা থাকার জন্য মৌলভীবাজার শহরে ভাড়া বাসা খুঁজছিলেন। এ খবর জানতে পেরে ভিকটিম মিষ্টি ও শুকলাকে সাবলেট হিসেবে থাকার প্রস্তাব দেন রিপা বেগম। প্রস্তাবে রাজি হয়ে শুকলা ও মিষ্টি মৌলভীবাজর শহরে জনৈক চাঁদ মিয়ার দুর্গামহল্লার রিপার ভাড়া বাসায় উঠে বসবাস করতে থাকেন। একই বাসায় অপর আসামি রিপার স্বামী আফসার মিয়া কাওছারও থাকতেন। কিছুদিন পর শুকলা সেখান থেকে অন্যত্র চলে যান। এক বাসায় থাকার সুবাদে ভিকটিম মিষ্টির সঙ্গে রিপার স্বামী আফসারের পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে অনৈতিক দৈহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ নিয়ে স্বামীর সঙ্গে রিপার সম্পকের্র চরম অবনতি ঘটে। প্রায়ই এ নিয়ে আফসার স্ত্রী রিপাকে মারধর করতেন। ঘটনার আগের দিনও আফসার স্ত্রীকে গালাগাল ও মারধর করলে রিপা মনের দুঃখে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ধুলিয়াখাল এলাকায় সৎবাবার বাড়িতে চলে যান।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আফসার মিয়া তাঁর স্ত্রী রিপাকে ফোন করে দুঃখ প্রকাশ ও অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করেন। রিপা আক্তার মিষ্টিকে মেরে ফেললে স্বামীর কাছে আসবেন বলে শর্ত দেন। মোবাইল ফোনেই তাঁরা হত্যার পরিকল্পনা করেন। সে অনুযায়ী প্রেমিকা মিষ্টিকে মৌলভীবাজার থেকে সঙ্গে নিয়ে শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজে আসেন আফসার। এরপর মিষ্টি ও আফসার রিপাকে শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজ এলাকায় আসার জন্য অনুরোধ করলে রিপা রাতে নতুন ব্রিজ এলাকায় যান। সেখানে রিপা তাঁর স্বামীকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘যদি তুমি মিষ্টিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে পারো, তাহলে আমি তোমার সংসার করব। নতুবা কোনোদিন আমি তোমার সংসারে ফিরে যাব না।’

এ অবস্থায় রিপার ক্রমাগত চাপে আফসার প্রেমিকা মিষ্টিকে মারতে সম্মত হন। মিষ্টির আড়ালে তাঁরা দুজনে হত্যার পরিকল্পনা তৈরি করেন। তারই অংশ হিসেবে আফসার নতুন ব্রিজের ফুটপাতসংলগ্ন জনৈক পান বিক্রেতার কাছ থেকে কৌশলে একটি ধারালো কাঁচি সংগ্রহ করেন। কাঁচিটি কৌশলে প্যান্টের পকেটে লুকিয়ে গাড়িতে করে আফসার তাঁর স্ত্রী রিপা ও প্রেমিকা মিষ্টিসহ চুনারুঘাট উপজেলার পাচারগাঁও গ্রামে নিজের বাড়িতে যান। সেখানে খাওয়া-দাওয়া শেষে পুনরায় মৌলভীবাজার শহরে তাঁদের বাসায় যাওয়ার কথা বলে আফসার ও রিপা ভিকটিম মিষ্টিকে কৌশলে চুনারুঘাট উপজেলার রানীগাঁও ও চাটপাড়া গ্রামের মাঝামাঝি হাওড়ে যোগীর আসন টিলায় নিয়ে যান। পথে স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে মিষ্টিকে মেরে ফেলার কথা ইশারা ইঙ্গিতে একে অপরকে আদান-প্রদান করেন। টিলায় আসার পর প্রথমে স্ত্রী রিপা আক্তারের সহায়তায় স্বামী আফসার ভিকটিম মিষ্টিকে টিলার পাদদেশে ফেলে ধর্ষণ করেন। পরে স্বামী-স্ত্রী মিলে মিষ্টির পরনে থাকা ওড়না দিয়ে তাঁর গলায় ফাঁস লাগিয়ে তাঁকে হত্যা করেন। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য আফসার তাঁর সঙ্গে আনা ধারালো কাঁচি দিয়ে মিষ্টির থুতনির নিচে গলায় সজোরে ঘা দেন। এরপর মৃত্যু নিশ্চিত করে আসামি আফসার মিষ্টির পরিচয় গোপন রাখার জন্য তাঁর পরনের জিন্স প্যান্ট খুলে ফেলেন এবং মিষ্টির সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন ও ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে যান। মিষ্টির জুতাসহ অন্যান্য কাপড় ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে চলে যান তাঁরা। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা কাঁচি ঘটনাস্থলে ফেলে যান। এরপর তাঁরা দুজনে ওই রাতেই মৌলভীবাজার শহরে ফিরে যান। মিষ্টির মোবাইল ফোন আফসার মৌলভীবাজার শহরে এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন।


৬ ফেব্রুয়ারি রাতেই পুলিশ স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে রিপার মরদেহ উদ্ধার করে অজ্ঞাতনামা হিসেবে দাফন করে। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করে।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা জানান, ২০-২৫ দিন আগে এ মামলার ঘটনাস্থলের পাশের এলাকা কারঙ্গী নদীর তীরে একজন অজ্ঞাতনামা লোক ফারুক নামের এক লোককে ঢাকা থেকে এনে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাত করে। ওই ঘটনার তদন্তকালে পুলিশ জানতে পারে, পাচারগাঁও গ্রামের এক লোক তাঁর পরিচয় গোপন করে কাওছার নামে সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেছে। পুলিশ কাওছারের প্রকৃত পরিচয় জানতে পারে। পরে পুলিশ তথ্য পায়, কাওছারের প্রকৃত নাম আফসার এবং তিনি অত্র মামলার ঘটনার দিন রাতে তাঁর স্ত্রী রিপা বেগমসহ একটি অপরিচিত মেয়েকে নিয়ে পাচারগাঁওয়ে নিজ বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। পরে আফসারের মাকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করলে একপর্যায়ে তিনি জানান, ঘটনার দিন রাতে তাঁর ছেলে আফসার তাঁর স্ত্রী ও জিন্স প্যান্ট পরা একটি মেয়েসহ বেড়াতে এসেছিল। পুলিশ ওই হত্যাকাণ্ডে আফসারের জড়িত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করতে তৎপর হয়। একপর্যায়ে এক নারী পুলিশ আফসারের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় শুরু করেন। আফসার তাঁর প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে এলে তিনি পুলিশের জালে ধরা পড়েন। পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মিষ্টি হত্যার দায় স্বীকার করেন। ভিকটিমের নাম মিষ্টি বলে জানালেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানেন না বলে জানান। তবে মেয়েটি মৌলভীবাজার শহরে ডিটারজেন্ট কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন বলে তিনি জানান।


সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন, চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ নাজমুল হক, পরিদর্শক (তদন্ত) চম্পক দাম।