শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



মৌলভীবাজারের ৩ উপজেলায় অনুসন্ধান: চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের খোঁজ মেলেনি, তাম্রলিপি স্থলের সন্ধান

নিউজ ডেস্ক




মৌলভীবাজারে শ্রীহট্টের প্রাচীনতম চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের খোঁজ মেলেনি। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল তিনদিন ধরে মৌলভীবাজার জেলার তিনটি উপজেলায় অনুসন্ধান চালিয়ে এ বিষয়ে কোনও তথ্য পাননি।

গত ২৫ জুলাই (শনিবার) থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ৩ দিন ধরে কুলাউড়া, জুড়ী ও রাজনগর উপজেলায় অনুসন্ধান চালান তারা। সোমবার তাদের অনুসন্ধান শেষ হয়। এসময়ে কোনও ধ্বংসাবশেষ বা প্রাচীন কোনও সূত্র উদ্ঘাটন করতে পারেননি তারা।


সর্বশেষ (২৭ জুলাই) সোমবার শেষদিনের অনুসন্ধানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলটি রাজনগর উপজেলার পাঁচগাও ইউনিয়নের পশ্চিম ভাগ এলাকায় অনুসন্ধান চালায়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও সন্ধান না পেলেও ১৯৬০ সালে পশ্চিম ভাগ এলাকার পরেশ পাল (৯০) এর বাড়ি থেকে প্রত্নলিপি উদ্ধার করা হয়েছে যে এটা তারা নিশ্চিত হয়েছেন।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এবং ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলের প্রধান ড. মো. আতাউর রহমানের নেতৃত্বে ওই দলের সঙ্গে ছিলেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ফিল্ড অফিসার মো. শাহিন আলম, সহকারী কাস্টোডিয়ান হাফিজুর রহমান, গবেষণা সহকারী ওমর ফারুক, সার্ভেয়ার চাইথোয়াই মার্মা।

রাজনগর উপজেলার পাঁচগাও ইউনিয়নের উত্তর পশ্চিমভাগ গ্রাম এখনও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই এলাকার বিভিন্ন স্থানে এখনো প্রাচীন মৃৎপাত্রের ভাঙা টুকরো পাওয়া যায়।

১৯৬১ সালে রাজনগরের পাঁচগাঁও ইউনিয়নের পশ্চিমভাগ গ্রামে ‘শ্রীচন্দ্র পশ্চিমভাগ তাম্রশাসন’ যে স্থানে পাওয়া গেছে, সেই স্থানটি (পরেশ পালের ভিটা) ও যিনি এটি সংগ্রহ করেন সেই পরশ পালকেও খুঁজে পান অনুসন্ধানে আসা প্রতিনিধি দল। ওই ভিটায় অসংখ্য মৃৎপাত্রের টুকরো দেখতে পেয়ে প্রতিনিধি দল ওই স্থানটিকে সাংস্কৃতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।


এর আগে অনুসন্ধানের দ্বিতীয় দিন রবিবার দিনব্যাপী জুড়ী উপজেলার সাগরনাল দিঘীরপার এলাকায় চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের পুরাকীর্তির বিষয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। কিন্তু, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিত্বের কোনও আলামত মেলেনি। অনুসন্ধান শেষে এলাকার প্রবীণদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দলটি। পরে গণমাধ্যমকর্মীদের এসব তথ্য জানান প্রতিনিধি দলের প্রধান ড. মো. আতাউর রহমান।

তবে এসময় এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলার সময় ২০ বছরের পুরনো কিছু পুঁতির পাথর পাওয়া যায় জগদিশ চন্দ্র শর্মা নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে।

নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর দুর্গ এলাকায়ও এমনি রকম ২৫০০ বছরের পুরনো কাচের পুঁতি পাওয়া গিয়েছিল। সেই রকম পুঁতি জুড়ী উপজেলার সাগরনাল ইউনিয়নে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের প্রতিনিধি দল। তবে কাচের পুঁতিগুলো আরও অধিকতর পরীক্ষা নিরীক্ষা করে গবেষণা করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তারা।

এলাকা পরিদর্শন, অনুসন্ধান ও মাঠ জরিপ করে পুরাকীর্তির কিছু আলামত সংগ্রহ করে প্রতিনিধি দল। তবে সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দল ধারণা করছেন, এই এলাকায় প্রাচীন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের কোনও নিদর্শন পাননি তারা। তবে এখানে প্রাচীন কোনও সভ্যতা, ব্যবসায়িক কেন্দ্র, ট্রেড সেন্টার বা কুমারশালা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া অনুসন্ধানের প্রথম দিনে শনিবার বিকেলে কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নে গিয়ে ঐতিহাসিক ভাটেরা তাম্রফলকটি পরিদর্শন করে অনুসন্ধান ও মাঠ জরিপকারী প্রতিনিধি দলটি।


এসময় তারা ভাটেরার রাজার টিলা এলাকায় ভাটেরা তাম্রফলক পরিদর্শন করে আলামত হিসেবে ইটের ভাঙা টুকরো, পাথর ও পাতিল সংগ্রহ করেন। ভাটেরা টিলায় বড় একটি দিঘী রয়েছে। এই টিলায় অবস্থিত রাজবাড়িতে ৭ ভাই ছিলেন। সাত ভাইয়ের মধ্যে সর্বশেষ রাজা ছিলেন ঈষাণ দেব। পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে শোনা এ তথ্য প্রতিনিধিদলটিকে জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয় ভাটেরা স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক মোহাম্মদ আলী চৌধুরী তরিক বলেন, ‘কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের কলিমাবাদ (সাত বাদশার টিলা/রাজার টিলা) এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ভাটেরা তাম্রফলকের নিদর্শনের পুরাকীর্তি অনুসন্ধান ও মাঠ জরিপ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মনে অনেক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সবাই মনে করছেন এই এলাকায় প্রাচীন রাজাদের অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। এটা খনন ও অনুসন্ধান করলে হাজার বছরের পুরনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

প্রতিনিধি দলের প্রধান এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান ৩ দিনের অনুসন্ধান শেষে বলেন, আমরা গত তিন দিনে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও রাজনগর উপজেলায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও অস্তিত্ব পাইনি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পরিদর্শনে এসে অনুসন্ধানের প্রথম দিনে ভাটেরা তাম্রফলক এলাকা থেকে প্রাচীন রাজাদের স্থাপনার কাজে ব্যবহৃত অনেক পুরাকীর্তির আলামত সংগ্রহ করেছি। এখানে প্রাচীন রাজাদের বসতি ছিল যে সেটা আমরা অনুসন্ধানে নেমে পুরাকীর্তি দেখে বুঝেছি। আগামী শুষ্ক মৌসুমে এই তাম্রফলক এলাকায় খনন কাজ শুরু করা হবে।

তিনি জানান, দ্বিতীয় দিনে জুড়ী উপজেলার সাগরনাল দিঘীরপার এলাকা পরিদর্শন করে স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে সংগ্রহে থাকা পুরাতন পুঁতির পাথরের কিছু স্যাম্পল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এগুলো দেখতে প্রায় ২৫০০ বছরের পুরনো পুঁতির মতোই লাগছে। তৃতীয় দিনে রাজনগর উপজেলার পশ্চিমভাগ এলাকায় অনুসন্ধান করেছি।


তিনি আরও বলেন, মৌলভীবাজারের ভাটেরা টিলা, রাজনগর পশ্চিমভাগ ও জুড়ীর সাগরনাল এই তিনটি এলাকাতেই প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতার অনেক নিদর্শন ছিল-তা জরিপ ও অনুসন্ধান করে আমরা অনুভব করছি।

প্রসঙ্গত গত ১৫ জুলাই ‘চন্দ্র বংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্র কর্তৃক স্থাপিত কথিত শ্রীহট্টের চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরাকীর্তি সম্পর্কে সরেজমিন জরিপ ও পরিদর্শন প্রতিবেদন প্রয়োজন’ উল্লেখ করে সিলেট অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালককে চিঠি দিয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. হান্নান মিয়া। চিঠিতে ‘কথিত বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরাকীর্তি অ্যান্টিকস অ্যাক্ট ১৯৬৮ অনুসারে সংরক্ষিত ঘোষণা ও সংস্কার-সংরক্ষণের কোনও সুযোগ আছে কিনা এ সম্পর্কে সরেজমিন পরিদর্শন পূর্বক আলোকচিত্র ও মতামতসহ প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।