শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



জুড়ীতে ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজের চেয়েও প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়, পরিদর্শনে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ

নিউজ ডেস্ক




সিলেটের মৌলভীবাজারে ছিল অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। চতুর্বেদ, চান্দ্র ব্যাকরণ, হিন্দু শাস্ত্রবিদ্যা, হেতু বিদ্যা, চিকিৎসা শাস্ত্র, জ্যোতিষবিদ্যা, শল্যবিদ্যা, ধাতু বিদ্যা, শব্দ বিদ্যাসহ নানা বিষয় পড়ানো হতো সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয়টি শুনতে আশ্চর্য লাগলেও মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলায় এক বৌদ্ধ রাজার বসবাস ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সেই চন্দ্র বংশীয় বৌদ্ধ রাজা শ্রী চন্দ্র খ্রিস্টীয় দশম শতকের প্রথম দিকে আনুমানিক ৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে জুড়ী উপজেলার সাগরনাল গ্রামে ‘চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কালের বিবর্তনে এটি হারিয়ে গেলেও সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে নতুন আগ্রহ আর আলোচনার।


বিষয়টি জানতে পেরে নড়েচড়ে বসেছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। ‘চন্দ্র বংশীয় রাজা শ্রী চন্দ্র কর্তৃক স্থাপিত কথিত শ্রীহট্টের চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরাকীর্তি সম্পর্কে সরজমিন জরিপ ও পরিদর্শন প্রতিবেদন প্রয়োজন’ উল্লেখ করে সিলেট অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালককে চিঠি দিয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি)। চিঠিতে ‘কথিত বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরাকীর্তি অ্যান্টিকস অ্যাক্ট ১৯৬৮ অনুসারে সংরক্ষিত ঘোষণা ও সংস্কার-সংরক্ষণের কোনো সুযোগ আছে কিনা এ সম্পর্কে সরজমিন পরিদর্শন পূর্বক আলোকচিত্র ও মতামতসহ প্রতিবেদন প্রেরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সিলেট অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আতাউর রহমান বলেন, প্রত্ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশ মতে আগামী ২২ ও ২৩শে জুলাই সরজমিন তদন্ত সাপেক্ষে প্রতিবেদন জমা দিবো।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হান্নান মিয়া (অতিরিক্ত সচিব) জানান, মন্ত্রী মহোদয় বিষয়টি আমাকে জানানোর পর আমি এটি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। আমি আমার আঞ্চলিক পরিচালককে বিষয়টি সরজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য চিঠি দিয়েছি। প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া গেলে আমরা পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। জাতীয় ঐতিহ্যের সন্ধানে আমরা যদি এটা উন্মোচন করতে পারি তবে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে বড় একটি পালক যুক্ত হবে। তিনি আরো বলেন, আমার কাছে তথ্য আছে রাজা শ্রীচন্দ্র বিক্রমপুর এলাকায় ছিলেন। সেখানে তার শ্রীহট্ট মণ্ডল ছিল। সেখান থেকে তিনি মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। আর যুদ্ধ যেহেতু করেছিলেন নিশ্চয়ই সেখানে স্থাপনা রয়েছে, স্থাপনা থাকার সম্ভাবনা বেশি।


সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ বলেন, এ বিষয়টি জানার পর আমি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ধ্বংসাবশেষের খোঁজে আমরা অন্তত সম্ভাব্য স্থানগুলোতে বোরিং করে দেখতে পারি।?

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং কলা ও মানবিকী অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোজাম্মেল হক বলেন, সিলেটের পশ্চিমভাগে শ্রীচন্দ্রের সাম্রাজ্য ছিল।
পশ্চিমভাগ তাম্রশাসন বরাদ্দ করা হয়েছিল ব্রাহ্মণদের বসবাসের জন্য। যেখানে ব্রাহ্মণদের ধর্মপ্রচার আর পূজা-অর্চনা ছাড়াও শিক্ষা-দীক্ষার একটা ব্যবস্থা ছিল। তবে সেটা যে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় নামে ছিল তা জানা নেই।

ভারতবর্ষে তাম্রশাসনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে তাম্রশাসন ছিল তামার পাতে লিখিত দলিল। রাজা-বাদশারা বিভিন্ন রাজকীয় নির্দেশ তামার পাতে খোদাই করে রাখতেন। চন্দ্রবংশীয় বৌদ্ধ রাজা শ্রীচন্দ্র এই তাম্রশাসন প্রদান করেছিলেন। চন্দ্র রাজবংশের রাজাদের মধ্যে শ্রী চন্দ্র ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ রাজা।

ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদারের ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ গ্রন্থ মতে- শ্রী চন্দ্রের শাসনামল ছিল ৯০৫-৯৫৫ সাল পর্যন্ত। তার সাম্রাজ্যভুক্ত এলাকার মধ্যে ছিল মানিকগঞ্জ, ঢাকা ফরিদপুরের পদ্মা তীরবর্তী এলাকা, শ্রীহট্ট অঞ্চল ও কুমিল্লা। যার রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। মৌলভীবাজার জেলায় ১৯৬১ সালে একটি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়। যেটির তথ্য মতে, আনুমানিক ৯৩৫ খ্রি: শ্রীহট্টে সম্পূর্ণ রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন রাজা শ্রীচন্দ্র। বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ কমলাকান্ত গুপ্ত চৌধুরী তার ‘Copper plates of Sylhet’ গ্রন্থে তাম্রশাসন সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে এতদঞ্চলে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করেছেন।


মৌলভীবাজার জেলায় আবিষ্কৃত পশ্চিমভাগ
তাম্রশাসন অনুযায়ী খ্রিস্টীয় দশ শতকের প্রথম ভাগে উত্তরে কুশিয়ারা নদী, দক্ষিণ ও পশ্চিমে মনু নদী এবং পূর্বে ইন্দেশরের পাহাড়ি অঞ্চল বা পাথরিয়া অঞ্চল এই সীমানার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল। সেই হিসেবে মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার সাগরনাল ইউনিয়নের দীঘিপাড় এলাকাকে ইঙ্গিত করা হয়। কারণ এখানে এককালে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এই জনশ্রুতির পাশাপাশি এ এলাকায় স্থানীয় কবরস্থানে কবর খুঁড়তে গেলে এখনো প্রাচীনকালের তৈরি ইটের টুকরা ও মাটির বাসন পাওয়া যায়।

উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, চন্দ্র রাজবংশ দশম ও একাদশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে শাসন করা একটি বৌদ্ধ ধর্মালম্বী রাজবংশ ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের এই রাজবংশ মূলত বাংলার সমতট অঞ্চল ও উত্তর আরাকান শাসন করত। চন্দ্র রাজবংশের শাসনকাল দশম ও একাদশ শতাব্দীর মধ্যে ছিল। চন্দ্র রাজবংশের পাঁচজন উল্লেখযোগ্য রাজার মধ্যে শ্রীচন্দ্র ছিলেন চন্দ্র রাজবংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজা। তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর শৌর্য-বীর্য ও সাফল্যের সঙ্গে রাজত্ব করেন। সমগ্র বঙ্গ এবং উত্তর-পূর্বে কামরূপ পর্যন্ত চন্দ্রদের ক্ষমতা সম্প্রসারণের কৃতিত্ব শুধুই শ্রীচন্দ্রের।

মৌলভীবাজার জেলার তাম্রশাসনে কামরূপ অভিযান সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। একই তাম্রশাসনে শ্রীচন্দ্রের উদ্যোগে সিলেট এলাকায় বিপুলসংখ্যক ব্রাহ্মণের বসতি স্থাপনের কথা জানা যায়। তিনি গৌড়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। দ্বিতীয় গোপালের শাসনকালে পালদের ক্ষমতা রক্ষাকল্পে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভূমিদান সম্পর্কিত তার ৬টি তাম্রশাসন এবং তার উত্তরাধিকারীদের তাম্রশাসনে শ্রীচন্দ্র সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায় তা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে বঙ্গ ও সমতটের বিস্তীর্ণ এলাকায় তার শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল।


রাজা শ্রীচন্দ্রের পশ্চিমবঙ্গ তাম্রশাসন বা মৌলভীবাজার তাম্রশাসনটিও (৯২৫-৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ) বাংলায় কম্বোজ শাসকদের শাসনকালে জারিকৃত একটি লিখিত দলিল। চন্দ্রবংশীয় রাজা শ্রী চন্দ্র (৯২৫-৯৭৫ খ্রি.) এই তাম্রশাসনটি জারি করেন। এতে সমতট দেশের খিরোদা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল দেবপর্বত-এর নাম উৎকীর্ণ এবং রাজা শ্রীচন্দ্রের পিতা রাজা তৈলক্যচন্দ্র কর্তৃক (৯০৫-৯২৫ খ্রি.) কম্বোজদের পরাজিত করার তথ্য বিধৃত। তাম্রলিপিটি পাঠোদ্ধার করে তাকে ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন আহমেদ হাসান দানী সম্পূর্ণ লিপিটি থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, লালমাই বনাঞ্চল হতে কম্বোজদের সৈন্য সমতট অঞ্চলে আক্রমণ করেছিল এবং চন্দ্র বংশীয় রাজা তৈলক্যচন্দ্র তাদের পরাজিত করে লালাম্বী রক্ষা করেছিলেন।

প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজের মাধ্যমে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাবিষ্কৃত ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেলে তা বাংলাদেশ তথা বিশ্বে ইতিহাস হয়ে থাকবে।