শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



বড়লেখাবাসীর অকৃত্রিম বন্ধু ও একজন নাসিমের চলে যাওয়া




ছালেহ আহমদ জুয়েল :: না ফেরার দেশে চলে গেলেন বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহচর জাতীয় চার নেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর ছেলে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য। একইসঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের মুখপাত্র ছিলেন। আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ নাসিমের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায় সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে।


তাঁর পিতা জাতীয় নেতা শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। যিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মোহাম্মদ নাসিম জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৬, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নাসিম। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে তিনি সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১৪-১৮ সরকারে নাসিম স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের সরকারে তিনি স্বরাষ্ট্র, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ১৪ দলীয় মহাজোটের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শুধুমাত্র জাতীয় নেতা মরহুম মনসুর আলীর সন্তানের পরিচয়ে তিনি নাসিম না। আজকের যে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভিত্তি হিসেবে যে ক’জন জাতীয় নেতার অবদান তার মধ্যে তিনি একজন। রাজনৈতিক জীবনে রাজপথে সবসময়ই সক্রিয় ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কারণে বিভিন্ন সময় নির্যাতন সইতে হয়েছে তাকে। রোষানলের শিকার হয়েছিলেন ১/১১ সরকারেরও। সে সময় গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে কাটান তিনি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় রাসেল স্কয়ারে পুলিশের-লাঠি আর বুটের তলায় পড়ে থেকেও আন্দোলন থেকে এক চুলও নড়েননি যে, ব্যক্তি তাঁর নাম মোহাম্মদ নাসিম। নাসিম পুলিশের আঘাত নিজের শরীরে নিয়ে কর্মীদের জন্য ঢাল হয়ে যেতেন।

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় থেকে প্রাণের নেত্রীকে বাঁচাতে মানব ঢাল তৈরি করে মারাত্নক আহত হয়ে নেত্রীর প্রাণ রক্ষা করেন। বাবার মতোই আওয়ামী লীগের সাথে আমৃত্যু বন্ধন গেঁথে রেখেছিলেন। আজকে যারা লাখ টাকার সিম ১৫০ টাকায় কিনে মোবাইল ফোনের মালিক হয়েছেন ও মোবাইলে বিপ্লব দেখাতে পারতেছেন তার অবদান এই নাসিম সাহেবেরই। পাবনা থেকে বাগেরহাট পর্যন্ত সর্বহারা বা পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সন্ত্রাসী, খুনীদের অত্যাচারে যারা সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে পারতেন না তাদের স্বস্তির নিশ্বাস এনে দিয়েছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই নাসিম। মূলত তাঁর দায়িত্বশীল ভূমিকায় গোটা দক্ষিণাঞ্চলন সন্ত্রাসীর জনপদ থেকে শান্তির জনপদে রুপ নেয়।


বড়লেখা ও জুড়ীর উন্নয়নের অবদানে সবার আগে যার নাম আসবে, তিনি হলেন মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বড়লেখাবাসীর অকৃত্রিম বন্ধু। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী মোহাম্মদ নাসিম স্থানীয় সাংসদ ও বর্তমান পরিবেশ মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন মহোদয়ের মাধ্যমে বড়লেখাবাসীর ঘরের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। পরিবেশ মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন মহোদয় বড়লেখা ও জুড়ীবাসীর কোনো দাবি নিয়ে গেলে খালি হাতে ফেরাননি। কারণ ব্যক্তিগতভাবে পরিবেশ মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন মহদোয়কে আপন ভাইয়ের মত দেখতেন। মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালীন বড়লেখা উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন স্থাপন, ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ স্থাপন, বড়লেখা উপজেলা সাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নিতকরণ, হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ, অ্যাম্বুলেন্স, জুড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপন করেছিলেন। ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পূর্বেও দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে বড়লেখায় এসেছিলেন। বড়লেখাবাসীর অকৃত্রিম এই বন্ধুকে হারিয়ে আমরা শোকাহত।

মোহাম্মদ নাসিম গণতন্ত্র, দেশ, দল, জনগণসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে যে অবদান রেখেছেন জাতি তা চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিককে হারালো। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা হারিয়েছেন একজন বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা। আওয়ামী লীগ হারালো একটি স্তম্ভ।


আল্লাহ যেন উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আমিন।

লেখক: সাবেক ছাত্রলীগ নেতা।