বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



শোক নিয়েই ইতিহাস গড়লেন ‘ক্যাপ্টেন কুল’, ভারত জয়ের নেপথ্যে যে জেদ

খবর: মানবজমিন




দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে ফাইনালে ধারাভাষ্য দেয়ার সময় আকবর আলীকে ‘ক্যাপ্টেন কুল’ আখ্যা দেন ক্রিকেটের বোদ্ধা বিশ্লেষক ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তির পেসার ইয়ান বিশপ। ফাইনালের ১৮ দিন আগে আকবর আলীর জীবনে ঘটে যায় ভয়াবহ ঘটনা। যমজ সন্তান জন্মদান করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন আকবরের একমাত্র বোন। কিন্তু স্বজন হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়েননি আকবর। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে দক্ষ নেতৃত্বে দলকে তুলে নেন ফাইনালে ।


আর ফাইনালের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ব্যাট হাতে হার না মানা ৪৩ রানের ইনিংস খেলে দেশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে মাঠ ছাড়েন ‘আকবর দ্য গ্রেট’।

গেল বছর অনূর্ধ্ব-১৯ দলের আক্ষেপটা ছিল মাত্র ৫ রানের। এশিয়া কাপের ফাইনালে ছুঁয়ে দেখা হয়নি কাপটা। সম্মানের কাপটায় চুমু না খেতে পারার আক্ষেপটা রয়ে গিয়েছিল আকবর আলীর মনে।

গোটা দলের মনে। সেবার শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে হেরেছিল ভারতের কাছে।

সেই আক্ষেপটাকে শক্তিতে পরিণত করেছেন তারা। বনে গেছেন বিশ্বসেরা। প্রথমবারের মতো কোনো বৈশ্বিক আসরের ফাইনালে খেলতে গিয়ে জয়ও ছিনিয়ে এনেছেন । বিশ্বসেরা হয়েছেন অপরাজিত থেকে।

তাদের জয়ে গোটা দেশ ভাসছে আনন্দে। এই বীরত্বগাঁথা জয়ের নায়ক উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান আকবর আলী। করেছেন ৭৭ বলে ৪৪ রান। ফাইনালে হারতে থাকা ম্যাচটাকে নিয়ে গেছেন জয়ের বন্দরে।

আকবর আলীর বাড়ি রংপুর শহরের জুম্মাপাড়ায়। বিশ্বকাপের আগে এসেছিলেন কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে। তার চাচাতো ভাই আবদুল খালেক বলেন, ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপের হারটা ভাইয়াকে কাঁদায় আজও। আমরা ক্ষেপাতাম তোমরা ভারতের সঙ্গে পারবে না। তখন ভাইয়া বলতেন, এবার সেমিফাইনাল বা ফাইনালে যেন ভারতের সঙ্গে খেলা পড়ে। এবার ভারতকে হারিয়ে দেখিয়ে দেবো। এটাই সত্য হলো। ভাইয়ার দল হারালো আবার ভাইয়া-ই ম্যাচ সেরা হলো।


আকবর আলীর প্রশংসায় ভাসছে গোটা দেশ। কিন্তু আকবরের বাড়িতে ভাটা পড়েছে সেই জোয়ারের। ২২শে জানুয়ারি বুধবার আকবরের একমাত্র বোন খাদিজা খাতুন পরপারে চলে যান। গর্ভকালীন পরবর্তী রোগে মৃত্যু ডেকে আনে তার। রংপুরের আরজি হসপিটালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

আকবরের ঘরে মা-হারা ২ যমজ শিশু সামিয়া ও সাঈদা। মা-হারা ছোট ২ শিশুকে আগলে রাখতেই ব্যস্ত পুরো পরিবার। একমাত্র বোনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি আকবরকে। ছোট্ট ফুটফুটে দুটি বাচ্চা আকবরের মা ও খালার কোলে। নিরলস চোখে তাকিয়ে আছে। নেই কান্না। তারা জানে না যে, তাদের মা নেই। কতো বড় সম্পদ হারিয়েছে তারা। আর তাদের মামা কতো বড় সম্মান বয়ে এনেছেন দেশের জন্য।

আকবর আলীর বাবা মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, বোনের মৃত্যুর খবর দেশের জন্য জানাইনি তাকে। সে দেশের জন্য ভালো খেলুক। বোনের মৃত্যু যাতে তাকে দুর্বল করে না দেয়।

তিনি আরো বলেন, খেলার একপর্যায়ে যখন বাংলাদেশ হারতে বসেছিল তখন আমি সবাইকে বলেছি বাংলাদেশ জিতবে। আকবর যতোক্ষণ আছে বাংলাদেশের কোনো ভয় নাই।

ছোট বেলা থেকেই ক্রিকেটপাগল আকবর আলী। বড় ভাই মুরাদ হোসেন তার বড় উৎসাহ। মুরাদ খেলেছেন সেকেন্ড ডিভিশন ক্রিকেট। তার ভাই মুরাদ ও এলাকার প্রতিবেশী জানান, আকবর ছোটবেলা থেকেই শান্ত-শিষ্ট। খেলা পাগল। ক্রিকেট খেলতেন উকিলের মাঠে। এখন সেখানে শুধুই বাড়ি। আকবর রংপুরের লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পাস করেন। এরপর সুযোগ মেলে বিকেএসপিতে। সেখানে তার পড়ালেখার জন্য কোনো খরচ করতে হয়নি। ভালো ফলাফলের জন্য বিনামূল্যে পড়েছেন তিনি। বয়সভিত্তিক অনূর্ধ্ব-১৪, ১৬ খেলেছেন। সফলতার কারণে অনূর্ধ্ব-১৭ দল থেকে করা হয় তাকে অধিনায়ক। এরই ধারাবাহিকতায় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান।


আরো জানা যায়, বাড়িতে আসলেই খেলতে বের হতেন। রাস্তায় শট ক্রিজেও ক্রিকেট নিয়ে মজে থাকতেন। তার বড় ভাই মুরাদ বলেন, এ বি ডি ভিলিয়ার্সের বড় ভক্ত তিনি। চেষ্টা করেন তার মতো খেলার। আকবর বয়সভিত্তিক সব খেলায় ভালো করে আসছে। সব টুর্নামেন্টে তার শতক ও অর্ধশতক আছে। তার ভালো করার একমাত্র কারণ পরিশ্রম। পরিশ্রমের কারণেই হয়েছে আজকের আকবর।

তিনি বলেন, আমি চাই সে আরো উন্নত করুক নিজেকে। এই সম্মান এই পারফরমেন্স জাতীয় দলে সুযোগ পেলে যেন ধরে রাখতে পারে।

ছোটবেলায় খেলা শিখেছেন অঞ্জন সরকারের কাছে। তার এই ক্রিকেট গুরু শীর্ষের খেলায় মুগ্ধ। তিনি বলেন, আকবর ছোটবেলায় ছিল অলরাউন্ডার। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি করতো অফ স্পিন। কিন্তু এরপর তার বল গ্রিপ করবার ক্ষমতা ও কৌশল দেখে হয়ে যায় উইকেট রক্ষক। আকবর উইকেট রক্ষক হওয়ার কারণে বলের মেরিট বুঝেছেন ভালোভাবে। এটাই তার ব্যাটিংকে এগিয়ে নিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আকবরের আরেকটা বড় গুণ সোজা ব্যাটে খেলা ও মাথা ঠাণ্ডা করে খেলা।

আকবরের বাবা মোহাম্মদ মোস্তফা আরো বলেন, আকবর শুধু আমার না গোটা দেশের গর্ব। আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই সকলকে যারা আকবরকে গোটা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। পৌঁছে দিয়েছেন গোটা বিশ্বের কাছে।

আকবর আলীর মা শাহিদা বেগম বলেন, আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। সে যেন আরো ভালো করতে পারে। দেশের জন্য আরো সম্মান বয়ে আনতে পারেন।


ফাইনালের দিন গোটা বাংলাদেশ যখন বাংলাদেশ বাংলাদেশ ধ্বনিতে স্লোগান তুলেছিল তখন রংপুরবাসীর মুখে শুধুই আকবর আকবর। গতকাল রংপুরের জুম্মাপাড়া এলাকায় সরজমিন দেখা যায়, আকবরের বীরত্বগাঁথা ইনিংস এবং বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জয়ে পোস্টার- ব্যানারে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। সিটি বাজার এলাকা থেকে তার বাড়ি অবধি শুধুই আকবরের ছবি। তার বাড়ির সামনে লাগানো হয়েছে বিশাল ব্যানার। রংপুরে আকবরকে স্বাগত জানিয়ে বেশ কয়েকটি মিছিল হয়।

রংপুরের ক্রিকেট পাড়াখ্যাত ক্রিকেট গার্ডেনে আলোচনার একটাই বিষয় আকবর। ক্রিকেট গার্ডেনে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া আসিফ খানকে নিয়ে এসেছেন তার মা লিমা খান। মাঠের পাশে বসে দেখছিলেন ছেলের খেলা। তিনি বলেন, একটা সময় ছিল খেলা ধুলা করলে মা-বাবারা বকা দিতেন কিন্তু এখন চিত্র ঠিক তার উল্টো। আমরা নিয়ে আসছি বাচ্চাদের।

আরেক মা তৌহিদা বেগম বলেন, রংপুরে আগেও জাতীয় দলে খেলেছেন অনেকে। নাসির হোসেন, আরিফুল হক, সোহরাওয়ার্দী শুভ, সাজিদ হোসেন। কিন্তু আকবর আলী আমাদের জন্য উৎসাহ আরো বাড়িয়ে দিলেন।