সোমবার, ২০ জানুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ


রাজনগরে ধান ক্রয়ে সিন্ডিকেট করে ব্যাপক দুর্নীতি, সংঘর্ষে আহত ২

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক




মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় সরকারিভাবে আমন ধান ক্রয়ে গড়ে ওঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় কৃষক তালিকায় বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে। এ নিয়ে কিছুদিন ধরে বিতর্ক চলছিলো। চলে চাপা উত্তেজনা। গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের পক্ষে আওয়ামী লীগের একটি অংশ অবস্থান নিলেও, আরেকটি পক্ষ বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।


এই অবস্থার মধ্যে বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে উপজেলা পরিষদ এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ২ জন আহত হয়েছেন। মনসুরনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ফরজান মিয়ার দোকান ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।

প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমের আমন ধান ক্রয় নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। কিন্তু কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতায় এই সিন্ডিকেট ধান বিক্রি করতে পারেনি। এই সিন্ডিকেট এবং ধান বিক্রির অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন উপজেলার অধিকাংশ ইউপি চেয়ারম্যানগণ এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের আরেকটি অংশ। এর জের ধরে কিছুদিন থেকে চলে আসা চাপা উত্তেজনা বৃহস্পতিবার সংঘর্ষে রূপ নেয়।

উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি বছরে কৃষকদের থেকে আমন ধান ক্রয়ের জন্য ৯ হাজার কৃষকের কাছ থেকে ১ হাজার ৪১৭ জনের তালিকা করেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাগণ। তালিকার প্রকাশের পর এ নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। রাজনগরের মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান করে দেখা যায় তালিকায় অর্ধেকের বেশী ভুয়া কৃষক। এমনকি একটি ফোন নাম্বার দিয়ে তালিকায় ঢুকেছেন ৫৭ জন।

আমন কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা, স্থানীয় খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা, ধান ব্যবসায়ী ও সরকার দলের একটি অংশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে- এই সিন্ডিকেটের উদ্দেশ্য প্রকৃত কৃষকদের ঠকিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া। আর তাই ভুয়া কৃষকদের নিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিতর্কিত তালিকা।


এ বিষয়ে খোঁজ নিতে সরজমিনে রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলে জানা যায়, তালিকায় ভুল ছিলনা। কিন্তু হাতে লেখা তালিকা প্রিন্ট হয়ে আসার সময় সঠিক তালিকা বদলে যায়। জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বারসহ হাতে লেখা তালিকা প্রিন্টের জন্য দেওয়া হয় উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক অসীম তালুকদারকে। সে তালিকা অসীম কুমারের হাত থেকে যখন প্রিন্ট হয়ে আসে, তখন ঢুকে পড়ে ভুয়া কৃষক ।

রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌসি আক্তার বলেন, তালিকা নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর কিভাবে তালিকা বদলে গেছে তা নিয়ে জানতে আমি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তলব করি। তখন উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক অসীম কুমার জানান, একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবে এবং চাপে এই তালিকা বদলে দিতে হয়েছে। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে বাধ্য হয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তিনি সিন্ডিকেটের সদস্যের নামও লিখিতভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়েছন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই সিন্ডিকেটে উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ময়নু ইসলাম খানের নেতৃত্বে পাঁচজন ধান মিলের মালিক রয়েছেন। উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক সিন্ডিকেটের নাম প্রকাশের পর তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কিছু নেতাকর্মী নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে মহড়া দেয় এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অপসারণ দাবি করে স্লোগান দেন।

এ বিষয়ে উপজেলা যুবলীগের সভাপতির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কৃষকের তালিকা নিয়ে ঝামেলা আছে, তাই আমরা এখানে অবস্থান নিয়েছি। তিনি ধান ক্রয়ের সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত কি-না জানতে চাইলে বলেন, তালিকা করেছে প্রশাসন। দায় থাকলে প্রশাসনের থাকবে। আমরা সিন্ডিকেটে ঢুকব কি করে।

তবে এই অবস্থান কোন দলের সিদ্ধান্ত নয় জানিয়ে রাজনগর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রুবেল আহমদ বলেন, যারা এখানে অবস্থান নিয়েছিল, তারা ব্যক্তিগত স্বার্থে সিন্ডিকেটের পক্ষে গেছে। কারো ব্যক্তিগত দায় সংগঠন নেবে না।


এই ঘটনার পর বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) এই বিতর্কিত তালিকার নিয়ে উপজেলা আইনশৃংখলা কমিটির সভা বসে। এ সময় উপজেলা কার্যালয়ের সামনে বিতর্কিত তালিকার পক্ষে অবস্থান নেন উপজেলা চেয়ারম্যান শাহাজান খানের সমর্থকরা। বিপক্ষে অবস্থান নেন মনসুর নগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মিলন বখতের সমর্থকরা। সভা শেষে বিকেল ৪টার দিকে উভয় গ্রুপ সংঘর্ষে জড়ায়। এ সময় ২ জন আহত হন এবং একটি দোকান ভাঙচুর করা হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও মনসুরনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মিলন বখত বলেন, আইনশৃংখলা কমিটির সভায় আমরা এই তালিকা নিয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তা হয়তো কারো স্বার্থে আঘাত লেগেছে। তাই তারা হামলা করেছে। আমাদের দুইজন আহত হয়েছে এবং একজন গরীব নেতার দোকান ঘর ভাংচুর করা হয়েছে। সিন্ডিকেটের বিপক্ষে, পক্ষে কারা আছে তা খুঁজে বের করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব। উপজেলা চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে এসে আমাদের ওপর হামলা করা হয়েছে।’

মিলন বখত বলেন, ‘বুধবার (১৫ জানুয়ারি) সিন্ডিকেটের পক্ষে একটি পক্ষ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং এসল্যিান্ডকে থ্রেট করেছে। বিক্ষোভ মিছিল করেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় ‘ইউএনও এবং এসিল্যান্ডের গায়ে জুতা মারো তালে তালে’ বলে মিছিল করেছে। তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। মিলন বখত বলেন, এ ঘটনায় দোষীদের শাস্তি ও ব্যবস্থা না নেওয়ার আজকে (বৃহস্পতিবার) এ ঘটনার সাহস পেয়েছে। এরকম সিন্ডিকেটরাই সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ধানক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বলেছেন। আমরা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবসময় প্রতিবাদ করে যাবো।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা চেয়ারম্যান শাহাজান খান সাংবাদিকদের বলেন, সকাল থেকেই পরিষদের অতিরিক্ত লোকজন ছিল। পুলিশ সবাইকে সরিয়ে দেয়। বিকালে আমার কার্যালয়ে লোকজন ছিলেন। মিলন বখত সাহেবের লোকজন একটি ফার্ণিচেয়ারের দোকন থেকে বের হয়ে আমার কার্যালয়ের সামনে থাকা লোকজনদের ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এসময় আমার দুইজন লোক আহত হয়।


এদিকে জানা গেছে, ধান ক্রয়ে সিন্ডিকেট এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এসিল্যান্ডের কাছে লিখিত রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। বাকি দু’টি ইউনিয়নের মধ্যে একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অসুস্থ। শুধুমাত্র একজন ইউপি চেয়ারম্যান বলেছেন তালিকা সঠিক আছে।

বিতর্কিত এই তালিকার বিষয়ে রাজনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌসী আক্তার বলেন, এসি ল্যান্ডের অফিসে সব ইউপি চেয়ারম্যানদের সাথে আলোচনা করে তালিকা স্থগিত করা হয়েছে। সভায় তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ ব্যাপারে মৌলভীবাজারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিয়াউর রহমান বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত আছে।

error: Content is protected !!