রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



হবিগঞ্জে ভালোবেসে বাবার পাঠানো মোবাইলটাই কাল হলো বিদয়ের

নিউজ ডেস্ক




হবিগঞ্জ শহরতলীর তেঘরিয়া গ্রামে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ইসমাইল হোসেন বিদয় (১০) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন হয়েছে। বাবার বিদেশ থেকে দেয়া মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়ার জন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছে। এক মাসের পরিকল্পনায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে প্রতিবেশী হবিগঞ্জ জেকে এন্ড এইচকে হাই স্কুল এন্ড কলেজের ৯ম শ্রেণির ছাত্র শাহরিয়ার মারুফ ওরফে সাইমিন।


সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নূরুল হুদা চৌধুরীর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এমন তথ্য দিয়েছে গ্রেফতার সাইমিন নিজেই। তার স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে বুধবার (১৫ জানুয়ারি) রাতে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা।

তিনি বলেন, গত ১০ জানুয়ারি উত্তর তেঘরিয়া গ্রামের সৌদি প্রবাসী ফারুক মিয়ার ছেলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ইসমাইল হোসেন বিদয় পোদ্দারবাড়ি এলাকায় নাটক দেখার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। প্রতিবেশী শাহরিয়ার মারুফ ওরফে সাইমিন নাটক দেখানোর জন্য তাকে নিয়ে যায়। কিন্তু রাত ৮টা পর্যন্ত বিদয় বাড়িতে ফিরে না আসায় তার মা বিষয়টি চাচাদের জানিয়ে বিদয়ের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনে যোগাযোগের জন্য বলেন।

বার বার তার মোবেইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা বন্ধ পান পরিবারের সদস্যরা। আশপাশে খোঁজাখুঁজি করে তাকে না পেয়ে মা শাহেনা আক্তার ওই দিন সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) করেন। বিভিন্ন পত্রিকায় নিখোঁজের সংবাদও ছাপা হয়। মাইকিং করা হয়। বিদয়ের নিখোঁজের বিষয়টি থানা পুলিশ তদন্ত অব্যাহত রাখে।

বিদয়কে খোঁজাখুঁজি করা অবস্থায় ১৩ জানুয়ারি সকাল ১০টায় সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের চরহামুয়া গ্রামের পাশে খোয়াই নদীর কিনারায় পানিতে একটি মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। বিষয়টি থানায় জানানো হলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেল মো. রবিউল ইসলাম, সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুক আলী, পরিদর্শক (অপারেশন) দৌস মোহাম্মদসহ একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পানি থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি ইসমাইল হোসেন বিদয়ের বলে শনাক্ত করেন। নিহতের মাথায় একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের সদস্যদের বুঝিয়ে দেয়া হয়।


এ ব্যাপারে নিহত বিদয়ের চাচা মো. টেনু মিয়া ১৪ জানুয়ারি বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয় সদর মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুক আলীকে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম, তদন্তকারী অফিসারসহ পুলিশের একটি টিম গোপান সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গত ১৪ জানুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টায় ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে শাহরিয়ার মারুফ ওরফে সায়মিনকে তেঘরিয়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। মরদেহটি উদ্ধারের পর থেকে সায়মিন নিজেকে আড়াল করে রাখে। আসামিকে গ্রেফতারের পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে তাকে ঘটনার ব্যাপারে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। অবশেষে সে বুধবার সন্ধ্যায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

আদালতে সাইমিন জানায়, পার্শ্বর্বতী বাড়ির ইসমাইল হোসেন বিদয়ের হাতে একমাস পূর্বে একটি বিদেশি ক্যামেরা মোবাইল সেট সে দেখে। মোবাইল সেটটি তার বাবা বিদেশ থেকে পাঠিয়েছেন। মোবাইল সেট নিয়ে বিদয় নদীর পাড়ে তার সহপাঠীদের ছবি তোলে। ওই মোবাইল সেটের প্রতি আসামি সাইমিনের প্রচণ্ড লোভ হয়। এ কারণে সে বিদয়ের সঙ্গে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলে। একপর্যায়ে ১০ জানুয়ারি বিকেলে সাইমিন শহরের পোদ্দারবাড়ি এলাকায় নাটক দেখার জন্য বিদয়কে প্রস্তাব দেয়। বিদয়কে মোবাইল সেট দিয়ে নাটকের ছবি ও ভিডিও করার পরামর্শ দেয়। এতে সে রাজি হয়।

সে অনুযায়ী সাইমিন বিকেল ৪টার দিকে বিদয়কে নিয়ে রওয়ানা হয়। তারা ধুলিয়াখাল-মিরপুর রোডের মশাযান ব্রিজের পর সিএনজি থেকে নামে। বিদয়কে নিয়ে আসামি সাইমিন তার নানা বাড়ি চরহামুয়া নোয়াবাদ যাওয়ার জন্য নদীর বেড়িবাঁধ দিয়ে রওয়ানা হয়। চরহামুয়া গ্রামের বেড়িবাঁধে গিয়ে নদীর চড়ে সবজি ও শস্যক্ষেত দেখে সাইমিন বিদয়কে নদীর ধারে গিয়ে ছবি তুলতে বললে বিদয় নদীর কিনারায় যায়। নাটকের মতো অভিনয় করে সাইমিন কলাগাছের ছোলা দিয়ে বিদয়ের দুই হাত সামনে দিয়ে বাঁধে, পা দুইটিও বাঁধে। সাইমিন পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ছবি তোলার ভান করে নদীর পাড়ে একটি বাঁশের মোড়া দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে বিদয়ের মাথায় কয়েকটি আঘাত করে। এতে বিদয় মারাত্মক আহত হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পরে বিদয়কে ধাক্কা মেরে খোয়াই নদীর ফেলে দ্রুত মোবাইল ফোনটি নিয়ে বাড়িতে চলে যায় সাইমিন।


পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা বলেন, বিদয়ের মোবাইল ফোনটি উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত আছে কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাইমিন এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন অনুতপ্ত।

সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম, ডিআই-১ কাজী কামাল উদ্দিন, সদর মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুক আলী, উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সাহিদ মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন ।