বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



লন্ডনের প্রচণ্ড শীত ও নানা বাড়ির অমলিন স্মৃতি




তাইসির মাহমুদ :: লন্ডনে এখন প্রচণ্ড শীত। আগামীতে আরো শীত পড়বে। লন্ডনের শীত মানে শীতই । শীতের সাথে কোনো আপস নেই। আজ বিছানায় ঘুমুতে গিয়ে ছোটকালের একটি মধুর স্মৃতি আমাকে বেশ আলোড়িত করে তুললো। শীত এলেই এই স্মৃতি আমার খুব মনে পড়ে। স্মৃতিটুকু আমার নানা বাড়িকে কেন্দ্র করে।


নানা বাড়ি আমাদের গ্রামেই । হেঁটে যেতে সর্বোচ্চ দশ মিনিটের রাস্তা। সকালে কুয়াশাঢাকা সকালে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় নানা বাড়ির পাশঘেষা রাস্তা দিয়ে হেঁটে মক্তবে আরবী পড়তে যেতাম । তাই প্রায়শই পড়া শেষে ফেরার সময় নানা বাড়িতে সকালের খাবার খেয়ে আসতে হতো । নানা নানী মামা খালারা কিছু না খেয়ে আসতে দিতেন না। এভাবেই ছিলো নানা বাড়ির আদর, মমতা, ভালোবাসা।

বাড়ির কাছে নানা বাড়ি হলেও শীতকালে মা কখনো ‘নাইওরী’ যাওয়া বাদ দিতেন না। প্রতি বছরই মাস পনেরো-দিনের জন্য যেতেন । আমরাও মায়ের সাথেই নানা বাড়ি থাকতাম। মায়ের সাথে নানা বাড়ি থাকার কী যে আনন্দ তা বুঝানো সম্ভব নয়। যাঁরা নানা বাড়ি থেকেছেন তারাই ভালো বুঝতে পারবেন।

নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। সারাদিন এ বাড়ি ও বাড়ি। এ ঘর ও ঘর ঘোরাঘুরি। কার বরই গাছে পাকা বরই আছে। সারাদিন গাছে গাছে ডালে ডালে। নানা বাড়ির সকলেই মামা, নানা কিংবা নানি। যার ঘরেই গেলাম অতিরিক্ত খাতির যত্ন।


গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে সুনাই নদী। বিকেলে দলবেধে গ্রামের ছেলেদের সাথে নদীতে সাঁতার। নদীর ওপারে চরে খেলাধুলা কিংবা শষাক্ষেত থেকে মালিকের অগোচরে শষা খাওয়া । নাওয়া-খাওয়া শেষ হলে বিকেলে গ্রামের দক্ষিণ পাশে ফুটবল, হাডুডুডু, কাবাডি, গোল্লা ছুট খেলায় মেতেওঠা। কত যে খেলাধুলা হৈ হল্লুড় মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়ানো। কি যে আনন্দ। খেলাধুলা শেষ হলে সন্ধ্যায় খড়কুটো যোগাড় করে আগুন পোহানো। এরপর বাড়ি ফেরা। বাড়ি ফিরে রাতে আরো কিছুক্ষণ চাঁদের আলোয় লুকোচুরি খেলা। এরপর খাবারের ডাক। এক সাথে বসে খাওয়া দাওয়া শেষে বিছায় ঘুমুতে যাওয়ার পালা।

নানা বাড়িটি অনেক দীর্ঘ। তাই লম্বা বাড়ি বলা হয় । নানার ভাই অন্য নানাদের ঘরও ছিলো কাছাকাছি । তাই আমরা রাতে দূর সম্পর্কীয় এক নানীর ঘরে ঘুমাতাম। নানির নাম কখনো জানা হয়নি। খুব ভালো অমায়িক একজন নারী ছিলেন। তিনি আমাদের কাছে জলিল মামার মা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন । বিধবা মহিলা। একমাত্র ছেলে ছিলেন আব্দুল জলিল।

তো ওই নানী কী করতেন। তিনি প্রতিদিন সকালে তাঁর নাতি নাতনীদের জন্য লেপ, তোষক, কাঁথা, বালিশ বাড়ির বাইরে রৌদে গরম করতে দিতেন । বিকেলে আবার মাথায় করে বাড়ি নিয়ে এসে ভাজ করে রাখতেন যেনো ঘুমানোর আগ পর্যন্ত গরম থাকে। রাতে আমরা বিছানায় যাওয়ার সময় হলে তিনি লেপতোষকের ভাজ খুলে বিছানা করে দিতেন। আমরা বিছানায় পরম আহলাদে আনন্দে শুয়ে পড়তাম । কারণ বিছানা থাকতো গরম। পৌষ কিংবা মাঘ মাসের হাড় কাপানো ঠাণ্ডায় কী যে আরাম- তা ভাষায় প্রকাশের মতো নয়।


তাই আজও জীবনের ৪৬টি বসন্ত পেরিয়ে এসে সেই স্মৃতিটুকু ভুলতে পারি না । আজও সাত সমুদ্র তেরো নদীর এপারে লণ্ডন শহরে ঠাণ্ডার দিনে যখন শিতল বিছানায় যাই, ঠাণ্ডায় কেঁপে ওঠি। তখন জলিল মামার মায়ের সেই গরম তোষকের কথা মনে পড়ে। তাঁর কথা ভাবি। মনে হয় তিনি আসলেই একজন মহিয়সী নারী ছিলেন। তিনি আজ বেঁচে নেই। কিন্তু রেখে গেছেন এমন এক স্মৃতি- যা আমার জীবনে কখনো ভুলবো না, ভুলতে পারবো না।

আজ তাঁর এই স্মৃতি থেকে আমার কাছে যা শিক্ষনীয় তা হলো: এই ছোট ছোট স্মৃতিগুলোই মানুষকে মানুষের মধ্যে যুগযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে। তিনি এমন একটি কাজ করেছেন যার জন্য তিনি আমার মনের মনিকোটায় আজীবন অম্লান হয়ে আছেন।

আমরাও আমাদের জীবনে নিজের আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধু-বান্ধবদের জন্য এমন ছোট খাটো কিছু একটা করার মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে আজীবন অমর হয়ে থাকতে পারি।

মানুষের মৃতু্যর পর মানুষ এসব কথা, স্মৃতি মনে রাখে। মানুষ মানুষকে স্মরণ করে। ভালো কাজের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে স্থান করে নিয়ে পরপারে বসেও মানুষের দোয়া পাওয়া যায়।

এতে কিন্ত আমাদের পয়সা খরচ করতে হয় না । জলিল মামার মা কিন্তু পয়সা খরচ করেন নি। তিনি সামান্য কায়িক পরিশ্রম করেছেন। সকালে লেপ-তোষক বালিশ নিয়ে বাড়ি বাইরে রোদ পোহাতে দিয়েছেন। বিকেলে সেগুলো ঘরে তুলে এনে ভাজ করে রেখেছেন। এই সামান্য কাজটি করে তিনি আমার অন্তরে স্থান করে নিতে পেরেছেন। একদিনের জন্য নয়, আজীবনের জন্য। যখনই আমার তাঁর কথা মনে হয়। আমি তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি, দোয়া করি। বলি, হে আল্লাহ তুমি তাঁকে মাফ করে দাও। জান্নাতে সমাসীন করো।


আমি বিশ্বাস করি। আমিও যদি জলিল মামার মায়ের মতো কারো জন্য সামান্য কিছু করতে পারি, তাহলে তিনিও আমাকে এভাবে মনে রাখবেন। আমরা মৃতু্যর পর তিনি আমাকে স্মরণে রাখবেন, আমার রুহের মাগফেরাত চাইবেন। তার দোয়া আমার পরপারে পার পেয়ে যাওয়ার উপলক্ষ হয়ে যেতে পারে।

তাইসির মাহমুদ
সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ
ডেগেনহ্যাম পূর্ব লন্ডন।