শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ



সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা সম্পর্কিত কিছু কথা




শামীমা এম রিতু :: প্রথমেই বলে রাখি যে, বৃহত্তর সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে এবং বাংলা হতে তা পৃথক। যা নাগরী বর্ণমালা নামে পরিচিত। নাগরীও দুই ধরনের রয়েছে- দেবনাগরী ও সিলেটী নাগরী। সিলেটী ভাষা লিখা হতো সিলেটী নাগরী লিপিতে। কালের বিবর্তনে সিলেটের ভাষা বাংলা বর্ণে লেখা হয় এবং তা থেকে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হচ্ছে। সবাইকে সবকিছু জানতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ এতটাই বিজ্ঞ হয়ে গেছেন যে, পৃথিবীর যে কোনো ভাষাকেই অসম্মানজনক/অপমানজনক বা হেয় দৃষ্টিতে দেখা ঠিক নয় তা স্বীকার করতে চান না। তাদের কয়েকটি যুক্তি নিয়েই নিম্ন লেখাটি।


১. কাঁচা ভাষা:
অনেকে সিলেটের ভাষাকে সরাসরি কাঁচা ভাষা বলে থাকেন এবং আঞ্চলিক শব্দের সাথে প্রমিত বাংলা শব্দ জুড়ে দিয়ে কিছু লেখেন। কিছু মানুষ আবার প্রমিত শব্দটাই বুঝেন না, সেখানে তারা “শুদ্ধ ভাষা” কথাটি ব্যবহার করে থাকেন। তারা হয়তো জানেন না যে, ভাষা কখনোই অশুদ্ধ হয় না। সেটা যে কোন সুসভ্য বা অসভ্য জাতি/উপজাতির ভাষা হোক না কেন। কেননা, যে কোনো জাতিই তার মনের ভাব প্রকাশের জন্য তার ভাষা ব্যবহার করে এবং অন্য সদস্যরা তা বুঝতেও পারে। ভিন্ন জাতির লোক সে ভাষা বুঝতে না পারার কারণে ভাষাকে অপমান করে অশুদ্ধ/অশালীন বলাটা কখনো ভাল হতে পারে না।

প্রচলিত অর্থে কাঁচা ভাষা বলতে আমরা অশালীন শব্দকে বুঝি। ‘কাঁচা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘অপরিপক্ক’। কাঁচা ভাষা বলতে অপরিপক্ক ভাষাকে বোঝায়। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ এটিকে নেতিবাচক অর্থে প্রকাশ করেন। ভাষা কখনো নেতিবাচক অর্থে কাঁচা বা অশালীন হয় না। শব্দ অশালীন হয়। যেমন, গালাগালিতে ব্যবহৃত শব্দ। পৃথিবীর সব ভাষাতেই অশালীন শব্দ আছে। কথা হলো, শব্দ নিয়ে কটুমন্তব্য করার আগে বা ভাষাকে অব্যবহৃত বলে দোষারোপ করার আগে নিজে ভাষার প্রয়োগ কতটুকু জানি তা দেখতে হবে সেই সাথে মনে রাখতে হবে যে, ‘এক দেশের গালি আরেক দেশের বুলি’। আমার লেখার বিষয় ছিল সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা। সিলেটী ভাষার অশালীন শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে নিম্নে একটি উদাহারণ দেয়া হলো –

ইগু/ইকটা (এটা- কোনো জিনিস নির্দেশার্থক)
কিগু/কে-কোনটা/কোনটি
এখানে “ইগু” শব্দটি শুনতে অশালীন লাগে তাই “এটা” বুঝাতে “ইকটা” শব্দটি ব্যবহার করা যায়। প্রসঙ্গ বলতে হচ্ছে ‘কিগুরে ডাকো’ না বলে ‘কারে ডাকো? কে ডাকো এটা বলা যায়।
এ সম্পর্কিত আরেকটি উদাহারণ দেয়া যেতে পারে- বাউল শফিকুন নুরের একটি আঞ্চলিক গান

“চাঙ্গো কিতায় লড়ে গো নানি
চাঙ্গো কিতায় লড়ে
মাতিচ না গো মাইলেনেউরি
বিলাইয়ে উন্দুর মারে।”
এখানে চাঙ্গো মানে- মাচা/ঘরের চাল
মাইলেনেউরি- হাস্যরসাত্মক শব্দ (দাদা/দাদি, নানা/নানী-নাতি-নাতনীদের মধ্যে হাস্যরসে ব্যবহৃত হয়।)


যদিও গানটি গুনতে হাস্যরসাত্মক বা রম্য হলেও এর ভেতরে লুকানো আছে গভীর জীবনদর্শন, সেটা নিয়ে অন্য সময় আলোচনা হবে। উক্ত গানে নানী/দাদী সম্পর্কীয় কারো কাছে নাতনী সম্পর্কীয় কেউ জানতে চেয়েছে যে ঘরের চালে কি নড়াচড়া করছে আর উত্তর দাতা উত্তর দিয়েছেন যে ঘরের চালে বিড়ালে ইদুর ধরছে তাই শব্দ হচ্ছে। এখানে “মাইলেনেউরি”কে অনেকেই অশালীন বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু এ গানটিতে “মাইলেনেউরি” শব্দটিকে অশালীন মনে হয় না। সুতরাং বুঝা গেল শব্দের ব্যবহার কৌশল জানাটাই হলো মূল বিষয়। যদি কেউ সোজাসোজি ভাষাকে দোষারোপ করেন তবে বুঝতে হবে “নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা” এর প্রয়োগ করেছেন।

শুধু বৃহত্তর সিলেট নয়, অন্যান্য অঞ্চলের ভাষাতেও এ রকম শব্দের ব্যবহার রয়েছে। যেমন, বৃহত্তর রাজশাহী- রংপুর অঞ্চলে এক বন্ধু অন্য বন্ধুকে বা সমবয়সীরা মজা করে একে অন্যকে বলে “মামুর বেটা”। মামুর বেটা এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘মামাত ভাই’

২. উচ্চারণ ও লেখা:
সিলেটী ভাষা বর্তমানে লেখা হয় বাংলা বর্ণে। কিন্তু সিলেটী ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে আর যেহেতু বর্ণমালা আছে সেহেতু সে ভাষা লেখার নিজস্ব নিয়ম কানুন থাকাটাও স্বাভাবিক। যা অনেকেই জানেন না। কোনো এক ভাষাবিদ বলেছিলেন, মানুষের ভাষা নদীর জলের গতির সাথে পরিবর্তিত হয়, তাই পরিবর্তিত নিয়মের সাথে তাল মেলাতে বাংলা বর্ণে সিলেটী ভাষা লেখা সম্পর্কে বিভিন্ন গুণীজন তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন এবং বেশির ভাগ জ্ঞানীগুণীরাই নিম্ন লিখিত নিয়ম সম্পর্কে একমত পোষণ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিখ্যাত লোকগবেষক আসদ্দর আলী, আহমেদ আমিন চৌধুরী, সৈয়দ মুজতবা আলী, ড. নূর ই ইসলাম (সেলু বাসিত), ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ। এছাড়াও সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস) এ এই বিষয়ে অনেক রচনা ও তথ্যাবলী সংরক্ষিত রয়েছে।

*বাংলা বর্ণে সিলেটী ভাষা লিখলে সেটা লিখতে হবে ব্যাকরণ ভিত্তিক। কোন ভাবেই উচ্চারণ ভিত্তিক হবে না। যেমন, বাংলাদেশকে বিভিন্ন জাতি- ভাষার লোক তাদের মতো করে উচ্চারণ করলেও আমরা সবসময় লেখি “বাংলাদেশ’- BANGLADESH.


*পাগল- শব্দটি উচ্চারণ অনুযায়ী “ফাগল” নয়। সিলেটীরা “প” কে “ফ” উচ্চারণ করেন। ঢাকার আঞ্চলিক ভাষীরা “চ” শব্দকে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে উচ্চারণ করেন এবং “শ” কে তারা “হ” উচ্চারণ করেন। কিন্তু লেখার সময় ঠিকই “চ” এবং “শ” লিখেন। এটা খুবই স্বাভাবিক একটা প্রাকৃতিক বিষয়। পৃথিবীর সব দেশেই এ রকম আঞ্চলিকতা রয়েছে। ল্যাটিন শব্দ National t এর উচ্চারণ উহ্য থাকলেও পৃথিবীর সবাই লেখার সময় National ই লিখেন ।

*হক্কল/অক্কল/সবাই কে বোঝাতে “হক্কল” লিখতে হবে। নাগরী বর্ণমালায় “অ” অক্ষরটি নেই কিন্তু ‘ও’ আছে। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ‘এখানে’ বুঝাতে ‘ও’ এবং ‘সেখানে’ বুঝাতে ‘হ’ ব্যবহার করা হয় ।

প্রতি ১৫/২০ মাইল অন্তর অন্তর আঞ্চলিক উচ্চারণে ভিন্নতা রয়েছে। সেটি খুবই স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক বিষয়। উচ্চারণ যে যেভাবেই করুক লিখার ক্ষেত্রে কখনো উচ্চারণ কে ভিত্তি হিসাবে মেনে নেয়া যায় না। কেননা, এটি যুক্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর।

সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর নিজস্ব বর্ণমালা সৈয়দ শাহনূর , মুন্সী সাদেক আলী, শাহ দৈখুরা (মুন্সী মুনিরউদ্দিন), দ্বীন ভবানন্দ, হাতিমুর রহমান, হাজি ইয়াছিন, আব্দুর রহমান, হাজির আলী প্রমুখ যেমন এই ভাষাতে নাগরী বর্ণমালায় নূর নছিহত, হালতুন্নবী, মহব্বত নামা, হাশর মিছিল, রদ্দে কুফুর, তালিব হুচন, আখের তরান, এস্কে মারিফত প্রভৃতি গ্রন্থাবলি রচনা করে মধ্যযুগের সাহিত্য ভান্ডারকে পরিপূর্ণ করেছেন তেমনি পরবর্তীতে রাধারমন দত্ত, দূরবীণ শাহ , আরকুম শাহ, কালা শাহ, হাসন রাজা , ক্বারি আমির উদ্দিন, বাউল শফিকুন নূর ,শাহ আব্দুল করিম, একে আনামসহ অসংখ্য গুণী গীতিকার সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় গান রচনা করে আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্ব ও রচনাশৈলীর কুশলতা প্রমাণ করে গেছেন। সেই সাথে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষাও বিশ্বে সমাদৃত হয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সিলেটে নাগরীর বর্ণমালার শ্রেষ্ঠ ছাপাখানা- সিলেট বন্দর বাজারের ‘ইসলামিয়া প্রেস’ ধ্বংস হলে নাগরী বর্ণে বই ছাপা ও প্রকাশের পথও রুদ্ধ হয়ে যায় এবং সিলেট বাংলাদেশের অধীনে থাকা ও বাংলা ভাষার চর্চা বৃদ্ধির ফলে লোপ পায় নাগরী বর্ণমালা। (সূত্র : মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস, রব্বানী চৌধুরী)


৩.
অনেকেই বলেন যে , আঞ্চলিক শব্দ/ভাষা নাটক/নাট্যাংশ, কথিকা বা কোনো খসড়াতে/স্ক্রিপ্ট এ ব্যবহার যোগ্য নয়। তাই তারা প্রমিত শব্দ মিশিয়ে লিখেন। যা একবারেই অনুচিত। সিলেটী ভাষা বরাক উপত্যাকার বহু প্রাচীন ভাষা। হয়ত লিখতে পারেন না তাই বলে ব্যবহার যোগ্য নয় বলাটা ভাষার জন্য অপমানজনক।

উপরোল্লিখিত আলোচনা দ্বারা এটা বোঝা যাচ্ছে যে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার যোগ্য কি না! উল্লেখ্য যে, ক্বারি আমির উদ্দিনের প্রায় ৪৫০০ অধিক রচনা রয়েছে। যার বেশিরভাগই সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত। বাউল শফিকুন নূর, শাহ আব্দুল করিম, রাধা রমন দত্ত, হাসন রাজা প্রমুখের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত অসংখ্য গান রয়েছে। সুতরাং, ব্যবহার করতে জানিনা বলে তো আর ভাষা অব্যহৃত বা ব্যবহারের অযোগ্য হতে পারে না। অযোগ্যতা আমাদের; ভাষার নয়।

বি: দ্র: এটি মূলত একটি অভিভাষণের সংক্ষিপ্তরূপ। তথ্য-জ্ঞানগত ত্রুটি সংশোধনীয়।


error: Content is protected !!