বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



যে কারণে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে লাইব্রেরি বিক্রির সিদ্ধান্ত




রিপন দে :: গোকুল চন্দ্র দাসের বয়স এখন ৬৫। ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবন শেষে ২০১৪ সালে ঢাকা গভর্মেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে অবসর নেন তিনি। দীর্ঘ এ জীবনে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে পড়িয়েছেন। তাদের অনেকেই স্ব স্ব স্থানে প্রতিষ্ঠিত। এমনকি বর্তমান সংসদের নাজমুল হাসান পাপন, মাহী বি চৌধুরী এবং নাহিম রাজ্জাক এমপি তার সরাসরি ছাত্র।


শিক্ষকতা করার পাশাপাশি বেশকিছু বই লিখেছেন তিনি। পাশাপাশি বই সংগ্রহ করে গড়ে তুলেছিলেন একটি লাইব্রেরি। সেখানে ১৫০টি বাংলা অভিধান, রবীন্দ্র-নজরুলের ২ শতাধিক ও বিভিন্ন গবেষণাধর্মী বই রয়েছে। সব মিলিয়ে ১৪টি স্টিলের বিশেষ আলমারিতে ৫০ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন তিনি এ লাইব্রেরি।

বইয়ের পাশাপাশি বাংলা ভাষার ওপর ৩৫০টি থিসিস আছে গোকুল চন্দের সংগ্রহে। বাংলা বই ছাড়াও বাংলাদেশে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকার বিশেষ সংখ্যাও তিনি সংগ্রহ করেছেন গত ৪৭ বছর ধরে। কিন্তু জীবনের শেষবেলায় এসে সন্তানের স্নেহে গড়ে তোলা সেই লাইব্রেরি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই মানুষটি। সম্প্রতি তিনি লাইব্রেরি বিক্রি করতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দিয়েছেন।

১১ অক্টোবর একটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার পর সেটা বিভিন্নভাবে ভাইরাল হয় সামাজিক মাধ্যমে। অভাবে পড়েই তিনি এ বিজ্ঞাপন দেন। এত বড় একটি লাইব্রেরি রাখতে প্রতি মাসে তার অতিরিক্ত ১৫ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়, যা তিনি আর দিতে পারছেন না। লাইব্রেরিটির মূল্য ধরেছেন প্রায় ২৫ লাখ টাকা।

তিন কন্যাসন্তানের জনক গোকুল চন্দ্র দাস ইতোমধ্যে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে বিবিএ শেষ করেছে মাত্র। বর্তমানে স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিন।


তিনজনের জন্য ছোট একটি বাসা হলেই তিনি থাকতে পারেন। কিন্তু এ লাইব্রেরির জন্য তাকে অতিরিক্ত একটি বাসা নিতে হয়েছে। সেই বাসার ভাড়া তিনি আর দিতে পারছেন না। গোকুল চন্দ্র দাস বর্তমানে ঢাকার ধানমন্ডি ৪ নম্বর রোডের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।

নিজের জীবন, চাকরি, লাইব্রেরি এবং তা বিক্রির কারণ নিয়ে কথা বলেছেন গোকুল চন্দ্র দাস। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭২ সালে নাগরপুর কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭৫ সালে টাঙ্গাইলের করটিয়া সরকারি সা’দত কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স করে ১৯৭৬ সালে মাস্টার্স করেন।

১৯৮০ সালে তিনি ঢাকা থেকে বিএড শেষ করেন। ১৯৮১ সালে একটি হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং সেখান থেকে ১৯৮২ সালে মিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হয়ে ১৯৯২ সালে ঢাকা গভর্মেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে যোগ দেন। সেখানে একটানা ২২ বছর শিক্ষকতা করে ২০১৪ সালে অবসর নেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বাংলা ব্যাকরণ ও রচনার ওপর সাতটি বই লিখেছেন। কবিতার বই প্রকাশ হয়েছে দুটি। এছাড়া তিনি বেশকিছু মাসিক ম্যাগাজিনের সম্পাদনা করেছেন।

লাইব্রেরিতে ২ হাজার বই আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, টাকার সমস্যা না হলে আমি এ লাইব্রেরি বিক্রি করতাম না। পেনশনের যে টাকা আমি পেয়েছি তা থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ করেছি। ৬৫ বছর বয়সে এত কষ্ট করে লাইব্রেরি রক্ষণাবেক্ষণ করা আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। তার ওপর প্রতি মাসে অতিরিক্ত ১৫ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়।


সরকার বা কোনো ব্যক্তি যদি পাশে দাঁড়ান তাহলে তিনি হয়তো লাইব্রেরিটি রক্ষা করতে পারেন। তবে তিনি এও জানান, বিজ্ঞাপনটি দেখার পর তার সাবেক ছাত্ররা বিভিন্নভাবে বড় একটি ফান্ড কালেকশনের চেষ্টা করছে। বড় অংকের কিছু টাকা পেলে ব্যাংকে রেখে সেই টাকার লাভ থেকে লাইব্রেরির ভাড়া দিতে পারবেন।