সোমবার, ১৯ অগাস্ট ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ


 




স্বজনহীন প্রবাসে কোরবানির ঈদ





‘প্রবাস জীবন কয়েদি জীবন
লক্ষ্য যে শুধু অর্থ উপার্জন’

দু’লাইন ছন্দ দিয়ে লিখার সূচনা করছি। প্রবাস জীবন অনেকটা ছন্দহীন, নিরানন্দ ও পরিশ্রমী জীবনযাপনের প্রবাস নামক ডায়েরির এক একটা পাতা যেন প্রবাসীদের জীবন গাঁথা। প্রবাস জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে কোনো না কোনো দুঃখ লুকিয়ে থাকে। প্রবাসীরা এক বুক কষ্ট নিয়েও হাসতে জানে। প্রবাসীদের ঈদ উৎযাপনও সে প্রবাস নামক ডায়েরির একটা পাতা। আজ পরবাসের মধ্যে প্রবাসীদের কোরবানির ঈদ অতিবাহিত হলো।


চিকিৎসা-বিজ্ঞান বলছে, একজন সাধারণ মানুষ সর্বোচ্চ ৪৫ ইউনিট ব্যথা সহ্য করতে পারে, অথচ মায়ের ‘প্রসবব্যথা’ কখনও কখনও ৫৭ ইউনিট পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়! অন্যভাবে বললে, একসঙ্গে ২০টি হাড় ভাঙাকালীন যে কষ্ট হবে, সন্তান জন্মকালে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পান একজন মা! কেউ আবার এই প্রসব ব্যথাকে মৃত্যু-যন্ত্রণার সঙ্গে তুলনা করেন।

মায়ের এই জন্মদানকালীন অনুভূতি, আরেকজন জন্মদাত্রী ছাড়া বোঝা একেবারেই অসম্ভব। যত-ই আকর্ষণীয় এবং প্রাঞ্জল ভাষায় ‘বার্থ পেইন’কে প্রকাশ করা হোক, যত-ই অস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী অভিনয় অভিনয় করে দেখাক না কেন, মায়ের এই কষ্টকে অনুভব করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

অনুরূপ পরবাসে থাকাকালীন প্রবাস জীবন কত বেদনার, কত কষ্টের জাল বোনার অভিজ্ঞতার চ্যাপ্টার তা প্রবাসজীবন অতিবাহিত না করলে বোঝার সাধ্য হওয়ার আশা ক্ষীণ। নিজ দেশে অবস্থান করে প্রবাসীদের নিয়ে বিভিন্ন ডকুমেন্টারি ও আর্টিকেল পড়ে প্রবাসীদের কষ্টের অনুভূতির ষোল কলার এক কলা পরিমাণও কি বুঝতে সক্ষম হবে? প্রবাস নামক ‘কয়েদ খানা’য় প্রবাসীরা নিজকে কীভাবে সঁপে দেয়, কত যে বঞ্চনা, নির্যাতন, উপহাস, হতাশা, প্রতারণা, মিথ্যা আশা ও বৈষম্যের শিকার হয়, তা কেউ জানে না। এত কিছু সত্ত্বেও শুধু অর্থ উপার্জনই হয়ে উঠে প্রবাসীদের মূল লক্ষ্য।


মা-বাবা, পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনহীন আরেক কোরবানির ঈদ অতিবাহিত হলো সৌদি প্রবাসীদের। কর্মেডুবে থাকা ব্যস্ততার মাঝেও প্রবাসীদের ঈদের প্রধান আনন্দ দেশে আপনজনদের জন্য টাকা পাঠানো। সময়মতো টাকাটা পাঠাতে পারলে প্রবাসীদের মনে এমন আনন্দের ঢেউ খেলে যেন সাগরের উত্তাল তরঙ্গকেও হার মানায়। প্রবাসীদের কোরবানির ঈদে টেলিফোনে আপনজনদের খবরা-খবর নেয়া হয়ে যায় মুখ্য উদ্দেশ্য। যেমন -গরু নেয়া হয়েছে কি? কত টাকা হয়েছে? সব ঠিকটাক হয়েছে কি? ইত্যাদি।

বেশিরভাগ প্রবাসী শ্রমিকদের কোরবানির দিন ব্যতিত ছুটি থাকে না। আবার অনেকের কোরবানির দিনও ডিউটি থাকে। ঈদের দিন ডিউটিতে থাকা অনেক প্রবাসীদের আক্ষেপ করে বলতে শোনা যায়-কী আর করব! বিদেশে আসছি টাকা উপার্জন করতে, আমাদের মতো হতভাগাদের ঈদ কী আবার? এ তো একটি কয়েদখানা।

এত কিছু সত্ত্বেও প্রবাসীরাও কিন্তু কোরবানির ঈদ পালন করতে পিছু নেই। কোরবানির ঈদের দিন বিভিন্ন আয়োজন করে থাকে প্রবাসীরা। কয়েকজন মিলে অংশীদারের ভিত্তিতে ছাগল কিনে জবাই করে আবার কেউ কেউ মিলে গরু কিনে জবাই করে। আবার কেউবা বাজার থেকে মাংস কেনে। প্রবাসে থাকা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের দাওয়াত করে। সবাই ভাবে এই কর্মময় জীবনে একটা দিন হলেও মিলেমিশে একবেলা খাওয়া-দাওয়া ও গল্প করি।


অনেক প্রবাসীদের দেখা যাই তাদের শুধু কোরবানির দিন ছুটি থাকে। ছুটির দিন ঈদগাহ থেকে এসে অনেকে ঘুমিয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে ছাগল জবাই করে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যায়, কেননা পরদিন আবার ডিউটিতে যেতে হবে যে।

এটাই প্রবাসীদের কোরবানির ঈদ উদযাপন।

লেখক: ক ম জামাল উদ্দীন

সূত্র: জাগো নিউজ


error: Content is protected !!