বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বাংলাদেশে বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনা ও লন্ডনের এয়ারপোর্টে অর্ধ-বোতল কাশির ওষুধের গল্প






তাইসির মাহমুদ:
২০১৮ সালের অক্টোবরের কথা। একটি বৃটিশ ডেলিগেশনের সাথে নরওয়ে সফরে গিয়েছিলাম। তখন বুকে-পিঠে ব্যথা ও প্রচণ্ড কাশি ছিলো। ঘর থেকে এয়ারপোর্টের উদ্দেশে বের হয়ে পথিমধ্যে ফার্মেসী থেকে এক বোতল কাশির সিরাপ কিনে খেতে শুরু করলাম। স্ট্যানস্টেড এয়ারপোর্টে পৌঁছতে পৌঁছতেই অর্ধেক বোতল শেষ করতে পারলেও অর্ধেক বোতল রয়ে গিয়েছিলো। এয়ারলাইন্সের কাউন্টার থেকে বোর্ডিংপাস নিয়ে যখন সিকিউরিটি কাউন্টারে পৌঁছলাম তখন হ্যাণ্ড লাগেজ ও আপাদমস্তক দেহ তল্লাশির পর তারা আমার হাতে কাশির আধা বোতল সিরাপ আবিস্কার করলেন। বললেন, এটা নেওয়া যাবে না। ফেলে দিতে হবে। আমি সাক্ষাৎ জোরে-সুরে কয়েকবার কাশি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলাম- সিরাপের বোতলটি সঙ্গে নেওয়া খুব জরুরি। কিন্তু সিকিউরিটি কর্মকর্তারা নাছোড়বান্দা। ডাস্টবিনে ফেলে না দিলে ভেতরে যেতেই দেবে না।

হঠাৎ একটা বুদ্ধি মাথায় এলো। বোতল খুলে আরো এক ঢোক গিলে মুখ লাগিয়ে তাদের হাতে তুলে দিলাম। তারা বললো, নাহ, এটা তো নেয়া যাবে না। আমি বললাম, একশ’ মিলিলিটার পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইন অ্যালাও করে। সুতরাং আইনগতভাবে আমি এটি নিতে পারি। তখনই মাথা নেড়ে সায় দিলেন এক কর্মকর্তা। আর কথা না বাড়িয়ে এবার একশ মিলিলিটার পরিমাণ সিরাপের বোতলটিসহ আমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হলো।

জানি, এ ধরনের অভিজ্ঞতা অনেকেরই থাকতে পারে। তবে আজকে এই অভিজ্ঞতাটুকু বর্ণনার কারণ হচ্ছে- বাংলাদেশে বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনা নিয়ে কিছু লিখতে চাই।

ফেসবুকের নিউজ ফিডে প্রথমে বিমান ছিনতাইর নিউজটি দেখি। কিন্তু হেডলাইন আমাকে নিউজের ভেতরে নিয়ে যেতে পারছিলো না। আমার কাছে ঘটনাটি কেমন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিলো। বলি কি, বিমান ছিনতাই! তাও আবার বাংলাদেশে? বাংলাদেশেও কি বিমান ছিনতাই করার মতো এক্সপার্ট লোক আছে? এটা আমার ভাবতে অবাক লাগে। তাই আমার কাছে নিউজটি প্রথম দিকে তেমন গুরুত্ববহন করেনি । কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন টিভি ও অনলাইন সংবাদপত্রে নিউজটি আসতে থাকে। ঢাকার শীর্ষস্থানীয় অনেকগুলো সংবাদপত্রের অনলাইন ছাড়াও বিবিসি বাংলার অনলাইনেও পড়লাম । তখন তো বিশ্বাস করতেই হয়। কিন্তু এর পরও যেনো শতভাগ বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিলো, নেপথ্যে অন্য কিছু থাকতে পারে ।

কিন্ত দিন শেষে অবশেষে যা দেখলাম তা হচ্ছে, বিমান ছিন্তাই চেষ্টার ঘটনা সম্পর্কে আমার অনুমান আসলেও ভ্রান্ত ছিলোনা। ছিনতাই চেষ্টাকারির হাতে ছিলো খেলনা পিস্তল। খেলনা পিস্তল দিয়ে ভয় দেখিয়েই বিমান ছিন্তাইর চেষ্টা চালিয়েছিলো সে। আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকশ কর্মকর্তারা খেলনা পিস্তলবহনকারীকে হত্যা করে বিমান ছিন্তাই প্রতিহত করেছেন। বাঁচিয়েছেন বহু মানুষের প্রাণ!

যখন কেউ কোনো এয়ারপোর্টের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হয়ে অস্ত্র নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে তখনই বুঝতে হবে তাকে সেটি করতে সুযোগ দেয়া হয়েছে। এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষই সেই সুযোগ করে দিয়েছেন। সিকিউরিটি কর্মকর্তারা সুযোগ না দিলে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করা দূরে থাক, একটি নেইল কাটার কিংবা আমার মতো আধা বোতল কাশির ওষুধ নিয়েও ভেতরে ঢুকতে পারবেনা। শুধু নরওয়েই নয়; গত দেড় দশকে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ভ্রমণ করেছি। তাই এয়ারপোর্টে দেহ তল্লাশির ধরন সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত আছি।

সেনাবাহিনী তাদের কাজ করেছে। কারণ ছিনতাই চেষ্টাকারীকে হত্যার আগে হয়তো তাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিলোনা যে, ওটা খেলনা পিস্তল। তবে আমার প্রশ্ন- এয়ারপোর্টের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী হয়ে কীভাবে সে খেলনা পিস্তলটি নিয়ে প্রবেশ করলো?

বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনা বোধহয় বাংলাদেশ বিমানের ইতিহাসে এই প্রথম। কিন্তু এতবড় একটি ঘটনার জন্ম ও একজন মানুষের প্রাণহানীর জন্য আসলে কে দায়ী? শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমাবন্দরের সিকিউরিটি বিভাগের কর্মকর্তাদের জবাব কী জানতে চাই?

লেখক: তাইসির মাহমুদ
সম্পাদক: সাপ্তাহিক দেশ,
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।







error: Content is protected !!