সোমবার, ১৯ অগাস্ট ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ


 




বড়লেখায় পৌর মেয়রের উদ্যোগ রাস্তা সম্প্রসারণে স্বেচ্ছায় জমি ছাড়, মালিকরা ভেঙে দিচ্ছেন সীমানা দেয়াল

নিজস্ব প্রতিবেদক





মৌলভীবাজারের বড়লেখা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দরগাবাজার-অজমির ভায়া মুড়িরগুল রাস্তা। রাস্তাটি এতদিন প্রায় সাত ফুটের মতো প্রশস্ত ছিল। এ রাস্তা দিয়ে একসাথে দুটি যানবাহন চলার সুযোগ ছিল না। বড় গাড়িও এলাকায় ঢুকতে পারতো না। এ নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে দুর্ভোগ পোহাচ্ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের এ দুর্ভোগ লাগবে উদ্যোগ নেয় বড়লেখা পৌর কর্তৃপক্ষ।

রাস্তাটি প্রশস্ত করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কয়েক দফা সভা করেন বড়লেখা পৌরসভার মেয়র আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরী ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল হাফিজ ললন। তাদের এ উদ্যোগে সাড়া দেন এলাকাবাসী। ভূমি মালিকরা ৪ ফুট করে দু’পাশ থেকে রাস্তার জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে নিজেদের দীর্ঘদিনের পাকা দেয়াল ও পাকা স্থাপনা ভেঙে দিচ্ছেন স্বেচ্ছায়। এই রাস্তাটি বর্তমানে ১৫ ফুট প্রশস্ত হচ্ছে।

গত ৬ অক্টোবর থেকে রাস্তা প্রশস্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। রাস্তার বর্তমান অবস্থা দেখে এলাকার মানুষ খুশি। এখন তারা গাড়ি নিয়েই বসত-বাড়িতে আসা-যাওয়া করতে পারবেন। একটি গাড়ি আসলে আরেকটি গাড়িকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। একসাথে দুটো গাড়ি এদিকওদিক আসা-যাওয়া করতে পারবে। এদিকে শুধু রাস্তা প্রশস্ত করতে জমিই ছাড়তে হচ্ছে না। গত ২৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার মুড়িরগুল গ্রামের একটি লন্ডনি বাড়ির প্রায় সাড়ে ৪০০ ফুট পাকা সীমানা দেয়াল ভাঙা হয়েছে। পৌর মেয়র, কাউন্সিলর ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে মালিক নিজেই শাবল দিয়ে দেয়াল ভাঙার সূচনা করেছেন।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে সোনাতোলা, পাটনা, ছিকামহল, অজমির, মুড়িগুল, পানিদার, মহদিকোনাসহ অন্তত দশ গ্রামের সহশ্রাধিক মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে আসা যাওয়া করেন।

সরেজমিনে ২৬ অক্টোবর শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বড়লেখা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দরগাবাজার-অজমির ভায়া মুড়িরগুল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ৭ ফুট প্রশস্তের রাস্তাটির দু’পাশ থেকে ৪ ফুট করে মাটি কেটে রাস্তা বড় করা হচ্ছে। ১৫ ফুট প্রশস্তের রাস্তা হবে। কারো বাড়ির সীমানার বড় বড় গাছ কাটা পড়ছে। কারো ভাঙা হচ্ছে স্থাপনা। এতে করে কোনো মনোকষ্ট নেই বাসিন্দাদের। উৎসাহের সাথে তাঁরা ভেঙে নিচ্ছেন নিজেদের স্থাপনা।

মুড়িরগুল গ্রামের লন্ডনি বাড়ির দেয়াল ভাঙর কাজ চলতে দেখা গেছে। বাড়িটির অন্তত সাড়ে ৪০০ ফুটের মত পাকা দেয়াল ভাঙা হচ্ছে। দেয়াল ভাঙার কাজ করছিলেন পৌরসভার শ্রমিকরা। তাদের একজন ফুল মিয়া বলেন, ‘লন্ডনি বাড়ির দেয়াল ভাঙার কাজ করছি বৃহস্পতিবার (২৫ অক্টোবর) থেকে। গ্রামের মানুষ সহযোগিতা করছে রাস্তা বড় করার কাজে। বড় বড় গাছ কাটা পড়ছে। কিন্তু কেউ আপত্তি করছেন না। সবাই সহযোগিতা করছেন।’

লন্ডনি বাড়ির বাসিন্দা হাজী হবিব আলী বলেন, ‘রাস্তাটি বড় করার জন্য মেয়র ও কাউন্সিলর অনুরোধ করেছেন। আমরা নিজে জায়গা ছেড়ে দিয়েছি। ক্ষতির সীমা নাই। অনেক ক্ষতি হয়েছে। দশজনের সুবিধার জন্য দেয়াল ভেঙে দিচ্ছি। মানুষ ভালোভাবে গাড়ি নিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। জনগণের সুবিধার জন্য দেয়াল ভাঙায় আমার প্রবাসী ভাইয়েরাও খুশি।’
কথা হয় এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষক মীর মুহিবুর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, ‘যদিও আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। কিন্তু জায়গা ছেড়ে দিয়েছি। রাস্তাটি বড় করার জন্য। অনেক সুন্দর রাস্তা হচ্ছে। পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর আমাদের সাথে আলোচনা করেছেন। উৎসাহ দিয়েছেন। মতবিনিময় সভায় করেছেন। কেউ কোনো জোর করেনি। আমরা স্বেচ্ছায় ভূমি ছেড়ে দিচ্ছি। রাস্তার জন্য আমার পরিবারের লোকজন ১০ শতক জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। সুন্দর এ উদ্যোগের জন্য মেয়র ও কাউন্সিলরকে আমরা ধন্যবাদ জানাই।’

গ্রামের আরেক বাসিন্দা জাহিদ আহমদ বলেন, ‘রাস্তাটি আগে ছোট ছিল। জরুরী সময়ে এলাকায় বড় গাড়ি প্রবেশ করতে পারত না। মানুষের খুব কষ্ট হত। রাস্তা বড় হওয়ার জন্য মানুষ স্বেচ্ছায় এখন জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে। মেয়র ও কাউন্সিলের আহবানে সাড়া দিয়ে।’

গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান, আহমদ আলী ও মোস্তফা উদ্দিন বলেন, ‘রাস্তা ছোট থাকায় অনেক সমস্যা হয়েছে। আত্মীয় স্বজন আসলে রাস্তার কারণে অনেক লজ্জা লাগতো। মানুষ অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। এলাকা সুন্দরের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছি আমরা। কত যে খুশি বুঝাতে পারবো না। প্রবাসীরা বেশি খুশি। কাজ শুরুর দিন থেকে প্রবাসীরা ফোনে খোঁজ খবর নিচ্ছেন রাস্তাটি বড় হচ্ছে শুনে। এ সমস্ত কিছুর জন্য মেয়র ও কাউন্সিলরের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। তাঁদের উদ্যোগের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে।’

৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুল হাফিজ ললন বলেন, ‘আমাদের মেয়র মহোদয় পৌরসভাকে মডেল পৌরসভা গঠনের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। রাস্তাটি প্রশস্ত করার জন্য দীর্ঘদিন যাবত আমাদের পরিকল্পনা ছিল। এ লক্ষ্যে আমরা ধীরে ধীরে রাস্তার পাশের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিন থেকে উদ্বুদ্ধ করেছি। এরপর এ মাসের ৬ অক্টোবর থেকে কাজ শুরু হয়েছে। দেয়াল ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে ২৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার। কাজ শুরুর পর এলাকাবাসী যখন রাস্তা প্রশস্ত ও সুন্দর হচ্ছে দেখেছেন। তখন তাঁরা বেশি উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। রাস্তার পাশে যাদের দেয়াল ছিল। তাঁরা নিজে থেকে আন্তরিকতার সহিত দেয়াল ভেঙে নিচ্ছেন। রাস্তাটি প্রশস্ত হওয়ায় অনেক মানুষের উপকার হবে। সবাই খুশিতে ভূমি ছেড়ে দিচ্ছে। কারোর মনে কোনো কষ্ট নেই। এলাকাবাসীর আন্তরিকতায় কৃতজ্ঞ আমরা।’

বড়লেখা পৌরসভার মেয়র আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে রাস্তাটি ছোট। এর দৈর্ঘ্য প্রায় তিন কিলোমিটার। রাস্তাটি ছোট হওয়ায় নাগরিক জীবন খুব কষ্টদায়ক ছিল। মানুষ অনেক কষ্ট করেছেন। জরুরী মুহুর্তে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এলাকায় প্রবেশ করতে পারত না। এখন সব গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে। এই দুর্ভোগ কমাতে আমি উদ্যোগ নেই। বেশ কয়েকবার এলাকার মসজিদগুলোতে মিটিং করেছি। কাউন্সিলরকে সাথে নিয়ে বাড়ি বাড়ি সভা করেছি। ২ বছর চেষ্টা করেছি। মানুষের অনুমতি নিয়ে কাজ শুরু করা হয়। গ্রামীণ এলাকা। বেশি দেয়াল পড়েনি। জমিই বেশি পড়েছে। সবাই স্বেচ্ছায় এখন জায়গা ছেড়ে দিছেন। পাকা স্থাপনা ভেঙে দিচ্ছেন। রাস্তা প্রশস্তের কাজ শেষ হলেই রাস্তা পাকা করা হবে। এই ওয়ার্ডের মানুষের সহযোগিতা উদাহরণ হিসেবে থাকবে।’


error: Content is protected !!